অণুগল্প: ক্ষুধা

রাস্তার পাশের একটা ছাপড়া হোটেলের সামনে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে চারটি ক্ষুধার্ত কুকুর। হোটেলের ভেতর থেকে কেউ রুটি কিংবা বিস্কুটের টুকরো ছুঁড়ে দেবে এই আশায় ওরা অপেক্ষা করছে সকাল থেকে । কিন্তু ভাগ্যদেবি বোধহয় আজ ওদের প্রতি খুব একটা সদয় নয়। দুপুর হতে চললো কিন্তু ওদের ভাগ্যে এখনো জোটেনি কিছুই। তারপরও তাদের ধৈর্যে কমতি নেই, 'সবুরে মেওয়া ফলে' নীতিতে বিশ্বাসী ওরা।

মেওয়া উড়ে এলো একেবারে হঠাৎ করে। হাওয়ায় ভর করে ফ্লাইং সসারের মতো একটা রুটি উড়ে এসে পড়লো ওদের মাঝখানে। মুহূর্তের মধ্যে রাগবি খেলোয়াড়দের মতো গোল হয়ে দাঁড়ালো ওরা রুটিটাকে ঘিরে। একে অপরকে মাপছে শঙ্কিত দৃষ্টিতে। চারজনেরই লক্ষ একমাত্র রুটিটার উপর।

সহসা একটা কুকুর সাহসের পরিচয় দিলো। বাকি তিন কুকুরের অস্তিত্ত্ব পুরোপুরি উপেক্ষা করে ঝাঁপ দিলো রুটি লক্ষ করে। কিন্তু ততোক্ষণে অন্য কুকুরদের মধ্যে একতা চলে এসেছে : তিন কুকুর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো হানাদার কুকুরটার উপর। এই যৌথ আক্রমণ সহ্য করতে পরলো না কুকুরটা। কুঁইকুঁই করে নিজেকে প্রতিযোগিতা থেকে প্রত্যাহার করে নিলো সে।

এখন লড়াই তিন কুকুরের মধ্যে। একটা কালো,দ্বিতীয়টা লাল এবং তৃতীয়টা সাদাকালোর মিশেল। তিন কুকুরই লোভী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রুটিটার দিকে। কিছুক্ষণ আগের সেই একতাভাব এখন উদাও। পেটে ক্ষুধা,চোখের সামনে খাবার; ধৈর্যের লাগাম বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পরলো না কালো কুকুরটা। আস্তেআস্তে অগ্রসর হতে শুরু করলো সে রুটির দিকে। কিন্তু বাকি দুই কুকুর টের পেয়ে গেছে তার মতলব। দু’জনের মধ্যে আবারো সঞ্চারিত হলো মৈত্রীভাবঃ ফলাফল - কেলে আউট ।

এখন প্রতিযোগী মাত্র দুজন। এই দু’জনের যে-কোনো একজনের ভাগ্যে জুটবে রুটিটা । গরর-গরর আওয়াজ করছে দুটোই। একে অপরের শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে লাফ দেওয়ার আগে। এবার সাদাকালো কুকুরটিই লাফ দিলো সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে। লড়াই চললো বেশ কিছুক্ষণ। কামড়াকামড়িতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষ পর্যন্ত ধরাশায়ী হলো লাল কুকুরটা।

খুশিতে আকাশের দিকে মুখ তুলে বিকট এক চিৎকার দিলো সাদাকালো। তারপর রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলেদুলে এগিয়ে গেলো রুটির দিকে। মুখ নামিয়ে রুটিটা তুলে নিতে যাবে,এমন সময় কোথা থেকে সাঁই করে উড়ে এলো একটা কাক। সাদাকালো কুকুরটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুটিটা ঠোঁটে তুলে উড়াল দিলো কাকটা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় যুদ্ধজয়ী কুকুরটা অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো উড়ে যাওয়া কাকটির গমনপথের দিকে।
...................

রামসিংহের ট্রেনিং

মূল: হরিশংকর পরসাঈ
রূপান্তর: মোসতাকিম রাহী
......................................................................................................................
হিন্দি সাহিত্যের জনপ্রিয় রম্যলেখক 'হরিশংকর পরসাঈ' এর 'রামসিং কি ট্রেনিং' গল্পটি মূল হিন্দি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছিলাম 'রামসিংহের ট্রেনিং' নামে। প্রকাশিত হয়েছিলো দৈনিক সমকালের সাহিত্যসাময়িকী 'কালের খেয়া'তে।
...........................................................................................................................

সংক্ষেপে হরিশংকর পরসাঈ: রম্যলেখক হিসেবে হিন্দি সাহিত্যে হরিশংকর পরসাঈ একটি পরিচিত নাম। জন্মগ্রহণ করেন ১৯২২ সালের ২২ অগাস্ট, ভারতের মধ্য প্রদেশের হোশঙ্গাবাদে। নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে কিছুদিন বনবিভাগে চাকরি এবং অধ্যাপনা করেন, কিন্তু কোনোটাতেই মন বসাতে না পেরে ১৯৫২ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণোদ্যমে লেখালেখি শুরু করেন। স্থায়ীভাবে আস্তানা গাড়েন জবলপুরে এসে। সেখানেই ’৫৬ সালে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘বসুধা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা। কিন্তু আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে বেশিদিন চালাতে পারেন নি পত্রিকাটি, মাত্র দু’-বছরের মাথায় ’৫৮ সালে ‘বসুধা’র অকালমৃত্যু ঘটে। ‘বিকলাঙ্গ্ শ্রদ্ধা কি দৌর’ বইয়ের জন্যে হরিশংকর ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে জবলপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে ডি লিট উপাধিও দেওয়া হয়।
প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ: ‘হাঁসতে হ্যায়, রোতে হ্যায়’, ‘ভূত কে পাঁও পিছে’, তব্ কি বাত অউর থি’, য্যায়সে উনকে দিন ফিরে’, ‘বৈষ্ণব কি ফিসলান’, ‘শিকায়াত মুঝে ভি হ্যায়’, ‘আপনি-আপনি বিমারি’, ‘ঠিঠুরতা হুয়া গণতন্ত্র’, ‘নিঠল্লে কি ডায়েরি’, ‘মেরি শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গ রচনায়েঁ’, বোলতি রেখায়েঁ’, ‘এক লেড়কি পাঁচ দিওয়ানে’, ‘অউর অন্ত্ মেঁ’,‘নট্ কি খোজ’, ‘মাটি কহে কুমহার সে’, ‘পাখন্ড্ অধ্যাত্ম’, ‘সুনো ভাই সাধো’, ‘বিকলাঙ্গ্ শ্রদ্ধা কি দৌর’। এছাড়া ছয়খন্ডে প্রকাশিত ‘পরসাঈ রচনাবলী’ ।
মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৫ সালের ১০ অগাস্ট।
......................................................................................................................

প্রতিদিন সন্ধ্যায় রামসিংহ আমার কাছে আসে। মুখোমুখি বসে ঘন্টাখানেক গালিগালাজ করে ফিরে যায়।
পড়শিরা হতবাক ওর এই কান্ডে। আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘ লোকটা কি পাগল হয়ে গেল নাকি?’
‘না,’ উত্তর দেই আমি।
তখন তারা আমাকে পরামর্শ দেয় রামসিংহকে ধরে কষে একটা ধোলাই দেওয়ার জন্যে, আর তাতে যদি আমার আপত্তি থাকে, তাহলে ব্যাপারটা যেন তাদের ওপর ছেড়ে দেই --প্রতিবেশীর দায়িত্ত্ব হিসেবে এই মহৎ কাজটি তারা সানন্দেই করবে।
কোনো জবাব না দিয়ে আমি হাসি।
তখন তারা মনে মনে আমাকে পাগল না কি কাপুরুষ ভাববে সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে।

রামসিংহ শুধু গালাগালি করেই ক্ষান্ত হয় না। একরাতে সে আমার বাড়িতে গাঁজার কয়েকটা পোটলা রেখে যায়। পরদিন সকালে এসে সে আমাকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য রাখার দায়ে। হাতকড়ার বদলে রুমাল দিয়ে আমার হাতজোড়া বাঁধে।
রামসিংহকে আমি ছোটো ভাইয়ের মতোই আদর করি। নিজেকে যোগ্য করে তোলার তার এই প্রচেষ্টা দেখে আমি খুশি না হয়ে পারি না। খুব দ্রুত রামসিংহ কাজ শিখে নিচ্ছে, বোঝা যায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে সে উন্নতি করতে পারবে।
আট-দশ দিন আগের কথা। রামসিংহের বড়ো ভাই হনুমান সিংহ বিষম হতাশ আর মনমরা হয়ে আমার কাছে আসে। বলে, ‘তুমি জানো, হরিশংকর, আমার ছোটো ভাই রামসিংহ ছুটিতে এসেছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে গেছে। পুরো বাড়িটাকে সে মাথায় তুলে রেখেছে। ঘরের দরোজা বন্ধ করে সে নিজে নিজে চিৎকার-চেঁচামেচি আর খিস্তি -খেউর করে। একদিন খিড়কির ফুটো দিয়ে আমি দেখলাম, আমাদের পূর্বপুরুষ আর রাজনীতিবিদদের যে-ছবিগুলো দেয়ালে টাঙানো আছে, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে সে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে।’
‘একদিন আমি আমার ছেলে মুন্নাকে পড়াতে রামসিংহকে বলে বাইরে চলে যাই। যখন বাড়ি ফিরে এলাম, তখন আমার বড়ো মেয়ে আমাকে বললো, ‘বাবা, রামসিংহ কাকার কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি? তুমি বাইরে চলে যাওয়ার পর মুন্না পড়া ছেড়ে উঠে বাইরে খেলতে চলে যায়। যখন সে ফিরে এলো তখন কাকা মুন্নাকে বললেন, ‘এই মুন্না, জলদি একআনা দে, নয়তো দাদাকে বলে তোকে মার খাওয়াবো।’
আমরা হাসাহাসি করতে করতে মুন্নাকে একআনা দিয়ে বললাম কাকাকে দিয়ে আসার জন্যে। হা ভগবান, উনি ঐ একআনা নিয়ে পকেটে রেখে দিলেন!’
‘রামসিংহ আজকাল উদ্ভট সব কান্ড করে বেড়াচ্ছে। ছোটো বাচ্চাদের পানি আনার জন্যে হুকুম দেয়, আর একটু দেরি হলেই চিল্লাতে শুরু করে: ‘জলদি পানি নিয়ে আয়, ভেবেছিস কী, অ্যাঁ? সাত বছরের জন্যে চোদ্দশিকের ভেতর ঢুকিয়ে দেবো।’
দোস্ত, আমি এখন কী করি, বলোতো? ওকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে হেসে বলে, ‘আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে, দাদা, অতো দুশ্চিন্তা কোরো না।’ ভাই, আমার মনে হয়, তার মাথা পুরোটাই খারাপ হয়ে গেছে।’

রামসিংহকে আমি ছোটোবেলা থেকেই চিনি। খুবই সৎ, ভদ্র এবং বিনয়ী ছেলে সে। আর একারণে ব্যাপারটা মেলাতে পারছিলাম না।
পরদিন রাস্তায় তার সাথে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপার কী, রামসিংহ, এসব কী শুনছি?’
সে বললো, ‘বুঝতে পারছি, হরিদা, দাদা আপনার কাছে এসে অভিযোগ করেছে। আসলে কেউ আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছে না। আমি সবাইকে বলছি, একটা মাস আমাকে সময় দাও। আমার মাথা পুরোপুরি ঠিক আছে, আমি পাগল হই নি।’
আমি বললাম, ‘তো তুই এসব উদ্ভট কাজ কেন করে বেড়াচ্ছিস?’
উত্তরে সে যে-গল্পটা আমাকে শোনালো, সেটা হুবহু তার ভাষাতেই এখানে উদ্ধৃত করছি:

‘হরিদা, আমি তখন সবে পুলিশে জয়েন করেছি। নতুন ইন্সপেক্টর। মনে তখন সততা, ন্যায়পরায়ণতা আর মানুষের সেবা করার চিন্তা। একজন সৎ, আদর্শ পুলিশ অফিসার হওয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একদিন সকালে পাশের গ্রামের একটা ছেলে এসে রিপোর্ট করলো, রাতের বেলা তাদের বাড়িতে চুরি হয়েছে। আমি খোঁজখবর করার জন্যে তাড়াতাড়ি সেখানে গেলাম।
‘ওদের বাড়ির উঠোনে একটা বুড়ো লোক মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলো। আমাকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে, ভীতস্বরে বললো, ‘দারোগা সাহেব, আপনি!’
উঠোনে একটা ছোটো খাট রাখা ছিলো, আমি গিয়ে সেটাতে বসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলাম।
‘বাবা, আপনার ঘরেই কি চুরি হয়েছে?’
‘কিছু না বলে লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, চুরি কি আপনার এখানে হয়েছে?’
সে বললো, ‘আমাকে বলছেন, হুজুর?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি।’
তখন বুড়ো বললো, ‘কিন্তু দারোগা সাহেব, আমার নাম তো ‘অ্যাই শালা বুড়ো’, ‘বাবা’ তো আমার নাম নয়।’
আমি বুড়োর কথা কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি আবারো জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, চুরি কবে হয়েছে?’
বুড়ো উত্তর না দিয়ে চুপ মেরে রইলো। আমি আবার জিজ্ঞেস করতেই বুড়ো হাত জোড় করে বললো, ‘ভুল হয়ে গেছে, হুজুর। ছেলেটা অবুঝ। আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম, এই ফাঁকে ছেলেটা রিপোর্ট করতে চলে গেছে। আমি থাকলে কিছুতেই রিপোর্ট করতাম না, আর আপনাকেও কষ্ট করে এখানে আসতে হতো না। ছেলেটার বয়স কম, না বুঝে রিপোর্ট করেছে, ওকে মাফ করে দিন, হুজুর।’
‘আমি ফাঁপরে পড়ে গেলাম। এই লোক বলছেটা কী? তাকে বললাম, ‘আপনি তো বড়ো আজব কথা বলছেন। চুরি হলেতো রিপোর্ট অবশ্যই করতে হবে। আমরা পুলিশেরা আছি কী জন্যে? আমাদের দায়িত্বই তো চোরদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া, আর আপনাদের চুরি যাওয়া মাল উদ্ধার করা। এবার বলুন, কখন চুরি হয়েছে, আর কী কী জিনিস খোয়া গেছে!’
বুড়ো আবারও চুপ মেরে গেল। অসহায় দৃষ্টিতে সমবেত লোকজনের দিকে তাকাতে লাগলো। বুড়োর ছেলে একটা গেলাসে করে দুধ এনে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো। আমি নিতে না চাইলে বুড়ো বললো, ‘নিন হুজুর, আমার পোষা গাইয়ের দুধ।’
আমি বললাম, ‘না না, এখন আমি ডিউটিতে আছি। আপনার কাছ থেকে কিছুই আমি খেতে পারবো না, এমনকি এক টুকরো সুপারিও না।’
আমি দেখলাম সমবেত লোকজন খুবই অবাক হয়ে গেলো আমার কথায়। বড়ো বড়ো চোখ করে তারা আমাকে দেখতে লাগলো। আমার প্রতিটি কথায় ওরা চমকে উঠছিলো, আর ফিসফাস করে কী সব বলছিলো একে অপরকে।
আমি বুড়োকে বললাম, ‘বাবা, আপনিও খাটে এসে বসুন আমার পাশে। মুরুব্বি মানুষ, দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন?’
‘এইকথা শুনে বুড়ো ভয় পেয়ে দু’পা পিছিয়ে গেলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে কানে কানে কী যেন বললো। আমি খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। ওরা এতো ভয় পাচ্ছে কেন? আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ওরা কানাকানি করেই চলেছে। একটু পর বুড়ো জেব থেকে কিছু টাকা বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, ‘হুজুর, আমি মানছি আমাদের ভুল হয়ে গেছে। ছেলেটার বয়স কম, না বুঝে রিপোর্ট করেছে। আমি হলে জীবনেও রিপোর্ট করতাম না। আমি জানি, আপনার অনেক কষ্ট হয়েছে, অনেক জরুরি কাজ ফেলে আপনি ছুটে এসেছেন। আপনার সময়ের মূল্য আছে, এই পঞ্চাশটা টাকা রাখুন। ছেলেটাকে মাফ করে দিন, ভবিষ্যতে এরকম ভুল আর কোনোদিন হবে না।’
‘আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম ওর কথা শুনে। কিছুক্ষণ গুম মেরে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘দেখুন, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হয় আপনি একটা পাগল, নয়তো আমি স্বপ্ন দেখছি। আমি কেন টাকা নেবো? সরকার আমাকে বেতন দিচ্ছে আমার কাজের জন্যে। এর বাইরে কারো কাছ থেকে একটা পয়সা নেওয়াও আমার জন্যে হারাম।’
বুড়োর প্রতিক্রিয়া হলো দেখার মতন। দেখলাম ভয়ের ছায়া সরে গিয়ে তার চেহারায় কঠোর একটা ভাব ফুটে উঠছে। উপস্থিত গাঁয়ের লোকজনদের দিকে তাকিয়ে সে বললো, ‘ কী, এখনো তোমাদের সন্দেহ আছে?’
সমস্বরে লোকজন জবাব দিলো, ‘না!’
তখন বুড়ো সবাইকে হুকুম করলো, ‘তবে আর হাঁ করে দেখছো কী, বাঁধো শালাকে!’
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকজন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হাত-পা বেঁধে ফেললো দড়ি দিয়ে। এরপর বুড়ো একটা লোকের দিকে ফিরে বললো,‘যা, থানায় গিয়ে ইন্সপেক্টর সাহেবকে বল, এক জোচ্চোর-ডাকাত পুলিশের উর্দি পরে ধোঁকা দিতে এসেছিলো আমাদের। বুঝতে পেরে আমরা তাকে বন্দি করেছি।’
‘মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার। চিৎকার করে বললাম, ‘আমি ঠগবাজ নই। আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর।’
‘তুই মোটেও পুলিশ ইন্সপেক্টর নস। এই পোশাক তুই চুরি করেছিস, আর পুলিশ সেজে এসেছিস আমাদের ধোঁকা দেওয়ার জন্যে। কিন্তু বাছা, আমাকে ধোঁকা দেওয়া এতো সহজ নয়। তুই কি ভেবেছিস আমি কোনোদিন পুলিশ দেখি নি, অ্যাঁ? পুলিশের লোক দেখতে দেখতে বুড়ো হয়ে গেলাম। পুলিশ কখনো তোর মতো সুন্দর ব্যবহার করে না। তুই একটা ঠগবাজ।’
‘আমি জানতে চাইলাম, ‘কেন তোমার সন্দেহ হলো যে, আমি পুলিশ নই?’
বুড়ো উত্তর দিলো, ‘তোর মধ্যে সাচ্চা পুলিশ অফিসারের কোনো লক্ষণই নেই। পুলিশ অফিসার দেখতে দেখতে আমি চুল পাকিয়ে ফেললাম। কেউ আমাকে ‘অ্যাই শালা বুড়ো’ ছাড়া কোনোদিন সম্বোধন করে নি। আমার তো তখনই সন্দেহ হয়েছে, যখন তুই আমাকে আদর করে ‘বাবা’ বললি। এরপর আমার ছেলে যখন দুধ নিয়ে এলো, তুই খেলি না। আমার দেওয়া টাকাও নিতে চাইলি না। কোনো পুলিশ অফিসার এরকম করবে না। আমরাতো কখনো চুরির রিপোর্টই করি না, পুলিশ আসবে এই ভয়ে। পুলিশ আসলেই বিরক্ত করে মারবে, টাকা চাইবে, মারধোর করবে। আর তুই বলছিস কি না এক পয়সাও নিবি না, উল্টো চোর খুঁজে বের করে শাস্তি দিবি! এরকম পুলিশ অফিসার তো আমি আমার বাপের জন্মেও দেখি নি। তুই অবশ্যই একটা জোচ্চোর-ধোঁকাবাজ। কিন্তু বাছা, কম্মো কাবার করতে পারলি না, তার আগেই ধরা পড়ে গেলি এই বুড়োর চোখে। এবার আসল পুলিশ অফিসার আসছে থানা থেকে। পাঁচ-দশ বছরের সাজাভোগ করার জন্যে তৈরি হয়ে যা।’

‘বুঝলেন, হরিদা, এরপর বিকেল পর্যন্ত আমি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওখানে পড়ে রইলাম। সন্ধে হওয়ার আগেই আমার এক সহকর্মী ইন্সপেক্টর এলো থানা থেকে। এসেই সে বুড়োর চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে শুরু করলো। বুড়োকে বললো, ‘কিরে শালা বুড়োর বাচ্চা, ওঁকে বেঁধে রেখেছিস কেন?’
গালি শুনে বুড়োর চেহারায় স্বস্তির ভাব ফুটে উঠলো। বললো, ‘এ কথাটাই আমি এই ঠগবাজ লোকটাকে বলছিলাম।’
এরপর আমার দিকে ফিরে বললো, ‘দেখেছিস, পুলিশ অফিসার এরকমই হয়, হুজুরের মতো। আর তুই কিনা ‘বাবা বাবা’ করছিলি!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রামসিংহ তার গল্প শেষ করলো। বললো, ‘এই দুরবস্থার পর আমি বুঝতে পারলাম, হরিদা, আমার ট্রেনিঙ অপূর্ণ রয়ে গেছে। পুলিশের উর্দি পরা অবস্থাতেও সাধারণ লোকজন আমাকে পুলিশ মানতে নারাজ। সবাই মনে করে আমি ঠগবাজ। তাই একমাসের ছুটি নিয়ে আমি বাড়ি চলে এসেছি, আমার ট্রেনিঙ পুরো করার জন্যে।’
আমি তাকে বললাম, ‘রামসিংহ, আমাদের বড়োই দুর্ভাগ্য যে, তোর-আমার দু’জনেরই পিতা এই ভবসংসার ছেড়ে চলে গেছেন। নইলে তাদের ওপর তুই প্র্যাকটিস করে দু-চারদিনের মধ্যে তোর অসমাপ্ত ট্রেনিঙ শেষ করতে পারতি। যাক, তা যখন হওয়ার নয়, এখন আমি আছি, তুই আমার ওপর প্র্যাকটিস চালিয়ে যা। তোর উপকারে আসতে পারলে আমি খুশিই হবো।’

এরপর থেকে রামসিংহ প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে এসে আমাকে গালাগালি করে, আর আমি হাসিমুখে তা হজম করি।
....................

কিছুই যাবে না ফেলা

কিছুই যাবে না ফেলা!
স্বল্প আদর-অল্প উষ্ণতা-একটু অবহেলা।

ঘোমটা ঢাকা একফালি চাঁদ
ভালোবাসার এই রঙিন ফাঁদ
গোলাপ-বেলির মালা
যাবে না কিছুই ফেলা!

অতি অবুঝ দু'টি পাগল
ভাঙতে চায় যে সব অর্গল
ভেজা-উষ্ণ-লবণ-ঘামে
সোনার তনু সোনার দামে
কেনা হবে আজকে রাতে, নয়কো হেলাফেলা!
যাবে না কিছুই ফেলা!

দু'জন কাঙাল প্রেমের সাধে
খুব নীরবে খুব যে কাঁদে
লোনা জলে একপলকে নদী কীর্তনখোলা!
কিছুই যাবে না ফেলা!

বিষণ্ণতায় কাটে সারাবেলা

মন খুব খারাপ ছিলো গতকাল, তাই দাঁড়াই নি সম্মুখে তোমার; পাছে তোমারও মনটা খারাপ হয়ে যায়--এই ভেবে। জমানো একবুক কথা ছিলো গতকাল,তবুও ফিরে এসেছি তোমার দরোজা থেকে, যদি গিয়ে দেখি, গাঢ় রূপমাখা মুখটি ভারী হয়ে আছে প্রচন্ড অভিমানে, সেই ভয়ে। কারো কাছে যাই নি গতকাল, এমনকি তাদের কাছেও না--বৈকালিক আড্ডায় যারা সুখ আর দুঃখ ভাগাভাগি করে আমার সাথে, সেইসব বন্ধুদের কাছেও। নিঃসঙ্গ থেকেছি পুরোটা বিকেল: একা-একা হেঁটেছি নদীর ধারে, নির্লিপ্ত হয়ে দেখেছি কাকের উৎসব: কতো আনন্দে জলে ভেসে যাওয়া মড়া ঠুকরে খাচ্ছে ওরা; এঞ্জিনের অভাবে প্রাণান্তকর শ্রমে দাঁড় টেনে যাচ্ছে এক বৃদ্ধ মাঝি। বড়ো স্টিমার যখন তার পাশ দিয়ে যায় ঢেউয়ের দোলায় জলের ছিটে এসে লাগে তার মুখে--এসব দেখেছি। তারপর, সন্ধ্যার আঁধার যখন একসময় ঘন হয়ে এলো, একবার ইচ্ছে হলো ফিরে যাই তোমার কাছে, গিয়ে বলি, ‘হাত দিয়ে দেখো এই বুকে, কতোটা কষ্ট লুকিয়ে আছে কাঙালের হৃদয়ে, কতোটা কষ্ট জমতে জমতে আমি আজ আপাদমস্তক কবি।’ কিন্তু ফেরা হয় না, আমার সংকীর্ণতার কারণে: কোনো এককালে এক মায়াবতী এসে ঘর বেঁধেছিলো এই কবির পুরো অস্তিত্ত্ব জুড়ে, সবটুক ভালোবাসা দিয়ে তার জড়িয়ে নিয়েছিলো এই যুবককে। তারপর, সহসা কার ভুলে,আজও হলো না জানা, এই ব্যর্থ কবির সমগ্র চেতনা জুড়ে থাকা সেই প্রণোদিনী সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে মুখ ফেরালো চিরতরে! এখন আসা যাওয়ার পথে দৈবাৎ কখনো দেখা হয়ে গেলে, তার নির্লিপ্ত মুখ দেখে আমি হয়েযাই ‘আজনবি’! সেই থেকে সেই ভয়ে আর কোনো মায়াবতীর দিকে আমি হাত বাড়াইনি আজ পর্যন্ত। তাই সরল বিশ্বাসে এগিয়ে আসা তোমার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখি সর্বদা: একজনের হিমেল অনলে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া এই আমি নিজেই যদি তোমাকে পোড়াতে শুরু করি! ভালোবাসা খেয়েছে আমার সবটুকু , পাছে সেই প্রতিশোধস্পৃহায় আমিও যদি তোমাকে লুপ্ত করে ফেলি! কবিরা ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু ভালোবাসতে জানে না! কবিরা আজীবন ঠকতে ঠকতে--আজনম কষ্ট পেতে পেতে, সর্বস্ব খুইয়ে তারপর কবি হয়! ভালোবাসতে জানে না বলেই কবিরা সব হারায়! মন খুব খারাপ থাকে আজকাল, বিষণ্ণতায় কাটে সারাবেলা --তাই বারবার ফিরে আসি তোমার দুয়ার থেকে।

ঠাট্টা

আর এগিয়ো না!
এখানেই থমকে দাঁড়াও।
জেনে নাও--
এজীবন যেপে কোনো লাভ নেই:
ফলাফল শূন্য!
পথের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখবে
যাপিত জীবনের পুরোটাই ছিলো ঠাট্টা!
তারচে'এই ভালো
এখানেই দু'জন থমকে দাঁড়াই
এখানেই যাই মরে;
মরে গিয়ে বেঁচে যাই
প্রগলভ এক ঠাট্টার হাত থেকে!

অন্যরকম কষ্ট

বেদনায় ছেয়ে গেছে মন
বিবর্ণ হয়েছে চারিদিক
বুকের ভেতর অন্যরকম অদ্ভুত এক কষ্ট!
সুন্দরের স্বপ্ন দেখি না আর
শুধু দু'চোখে এখন নগ্নতা
শব্দের জোড়া মেলে না তাই
নির্বাসনে গেছে কবিতা।
মৃত্যু আজ সম্মুখদ্বারে
ভালোবাসা আজ গুলিবিদ্ধ
বুকের খাঁচায় অন্যরকম অদ্ভুত এক কষ্ট!
অনেক কিছু আজো রয়ে গেছে বাকি
অনেক কথা আজো হয় নি বলা
প্রণোদিনীর হাতটা ধরে
কিছুটা পথ হয় নি চলা।
স্বর্ণচাঁপায় আজ রক্তের ছোপ
চিঠিটাও রক্তাক্ত
বুকের ভেতর অন্যরকম অদ্ভুত এক কষ্ট!

তুমি আছো বলে

তোমাকে ছাড়া এজীবনের কোনো মানে হয় না;
সবকিছু নিরর্থক মনে হয় তুমি না থাকলে!
তোমার একটুখানি শূন্যতায়
ভরা জ্যোৎস্না পানসে হয়ে যায়,
সৌন্দর্য হারায় শীতের সকাল;
নিদারুণ দৈন্যতায় ভরে ওঠে এই কবির গৃহখানি!
দুঃখ-কষ্টে ভরা এই জীবনে জড়িয়ে আছো বলেই
পথের শেষটুকু দেখার দুঃসাহস করতে সাধ জাগে!

বেচাকেনা

মূল: গি দ্য মোপাসাঁ
রূপান্তর: মোসতাকিম রাহী
......................................................................................................................
লেখক পরিচিতিঃ কবি ঔপন্যাসিক গল্পকার মপাসাঁ ১৮৫০ সালের ৫ অগাস্ট ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৬৯ সালে প্যারিসে তিনি আইন বিষয়ে লেখাপড়া শুরু করেন, কিন্তু শীঘ্রি তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয় ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের কারণে। এরপর ১৮৭২ থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত তিনি সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে প্রথমে মিনিস্ট্রি অভ ম্যারিটাইম অ্যাফেয়ার্স এবং পরে মিনিস্ট্রি অভ এডুকেশন-এ কাজ করেন। ১৮৮০ সালে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তাঁর সাহিত্যজগতে পদার্পন। মাত্র একদশক সাহিত্যচর্চার সুযোগ পান মপাসাঁ, এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি তিনশো ছোটো গল্প, ছয়টি উপন্যাস, বেশকিছু কবিতা এবং তিনটি ভ্রমণকাহিনী লেখেন। দুর্ভাগ্যবশত তারুণ্যের শুরুতেই তিনি সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন, যা তাঁকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। শেষে মারাত্মক মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়ে ১৮৯২ সালের ২ জানুয়ারি কন্ঠনালি কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্যারিসের একটি প্রাইভেট অ্যাসাইলামে ভরতি করা হয়, এবং সেখানেই পরের বছর অর্থাত্ ১৮৯৩ সালের ৬ জুলাই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই প্রতিভাবান সাহিত্যিক।
.....................................................................................................................

মিসেস ব্রুমেঁকে পানিতে চুবিয়ে মারতে চাওয়ার অপরাধে গ্রেফতারকৃত দুই আসামি -সিসেয়ার ইজাডোর ব্রুমেঁ এবং প্রসপার নেপোলিয়ন কর্নুকে ফৌজদারি আদালতে হাজির করা হয়েছে বিচারের উদ্দেশে। মিসেস ব্রুমেঁ অভিযুক্ত সিসেয়ার ব্রুমেঁর স্ত্রী।
ব্রুমেঁ এবং কর্নু - দরিদ্র দুই গ্রাম্য কৃষক -পাশাপাশি বসে অপেক্ষা করছে আদালতের পুরনো বেঞ্চে। প্রথমজন বেটেখাটো,মোটা, হাত-পাগুলো ছোটো-ছোটো আর ফুটবল সদৃশ গোল মাথাটি মনে হয় কেউ চেপে বসিয়ে দিয়েছে তার চর্বিবহুল ধড়ের ওপর, ঘাড় বলতে কিছু নজরে আসে না। টকটকে লালমুখে অসংখ্য ব্রণ। ছোটো একটা শুয়োরের খামার ছিলো তার একমাত্র আয়ের উৎস । বাস করতো ক্রিকেতো জেলার ক্যাশিভিল-লা-গোপিল গ্রামে ।
কর্নু হালকা-পাতলা মাঝারি উচ্চতার মানুষ, হাতজোড়া লিকলিকে লম্বা। মাথা সামান্য ঝুঁকে থাকে, বাঁকা চোয়াল, ট্যারা চোখ। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা, নীল রঙের একটা জামা পরে আছে সে। মাথার হলুদ রঙের কয়েকগাছি চুল খুলির সাথে লেপ্টে আছে, যা তার চেহারায় ভীতিকর বুড়োটে ভাব এনে দিয়েছে। লোকজনের কাছে সে ‘হরবোলা’ হিসেবে পরিচিত, কারণ গির্জার উপাসনা সংগীত থেকে শুরু করে সাপের আওয়াজ পর্যন্ত হুবহু নকল করতে পারতো সে। আর এ কারণে লোকজন চার্চের ধর্মীয়সভায় যোগ দেওয়ার চেয়ে কর্নুর মদের দোকানে হাজিরা দিতে বেশি পছন্দ করতো।
মিসেস ব্রুমেঁ সাক্ষীর জন্যে রাখা বেঞ্চে বসে ছিলো। হালকা-পাতলা শরীর, সাধারণ চেহারা, একজন কৃষকের বউয়ের যেরকম হওয়ার কথা। তাকে দেখে মনে হয় সারাক্ষণ ঝিমুচ্ছে । হাঁটুর ওপর হাত রেখে,নির্বাকদৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে ছিলো সে।
জজ তার জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘তারপর, মিসেস ব্রুমেঁ, তারা আপনার বাড়িতে এলো এবং আপনাকে পানিভর্তি একটা পিপের মধ্যে ফেলে দিলো···, এরপর কী ঘটলো, দাঁড়িয়ে বলুন।’
মহিলা উঠে দাঁড়ালো। বাঁশের মতো লম্বা সে ,শাদা একটা গোল টুপি পরে আছে মাথায়, যা দেখে পতাকা টাঙানো বাঁশের কথা মনে পড়ে। কম্পিত স্বরে, মনে করার চেষ্টা করতে করতে বলতে শুরু করলো সেঃ ‘আমি শিম কুটছিলাম, এমন সময় তারা বাড়িতে ঢোকে। তাদের দেখে আমার সন্দেহ হলো, কারণ তাদের মোটেও স্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো না। মনেমেনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোনো শয়তানি বুদ্ধি পাকিয়েছে দুটোতে মিলে। ‘তারা আমাকে আপাদমস্তক দেখছিলো,বিশেষ করে কর্নু, ট্যারা চোখে হাঁ করে দেখছিলো আমাকে। এই দুই কুঁড়ের বাদশার একসাথে চলাফেরা পছন্দ করতাম না আমি। জিজ্ঞেস করলাম,‘কী চাও এখানে?’তারা কোনো উত্তর দিলো না। আমার সন্দেহ ঘনীভূত হলো।’
এমন সময় বউয়ের কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে ব্রুমেঁ বললো,‘আমি তখন মাতাল ছিলাম !’
তখন কর্নু ব্রুমেঁর দিকে ফিরে ফিসফিস করে বললো,‘বলো না,দোস্ত,আমরা তখন পুরোপুরি টাল ছিলাম,আমাদের হুঁশ ছিলো না তখন। আর এ কথা মিথ্যেও নয় !’
তখন জজ জিজ্ঞেস করলেন,‘তোমরা তখন মাতাল ছিলে ?’
ব্রুমেঁ: জি, ধর্মাবতার, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
কর্নুঃ মদ খেলে কে না মাতাল হয়!
জজ মিসেস ব্রমেঁর দিকে দিকে ফিরে বললেন,‘ আপনি আপনার বক্তব্য শেষ করুন, মিসেস ব্রুমেঁ।’
মিসেস ব্রুমে আবার বলতে শুরু করলো,‘ব্রুমেঁ আমাকে জিজ্ঞেস করলো,‘তুমি কি একশো সৌস কামাতে চাও?’
আমি বললাম,‘হ্যাঁ,চাই।’ কেননা একশো সৌস উপার্জন করা চাট্টিখানি কথা নয়। তখন সে আবার বললো,‘তাহলে ভালো করে দেখো,আমি কী করি ! আর আমি যা বলি ঠিক তাই তোমাকে করতে হবে।’ তখন সে বৃষ্টির পানি ধরার জন্যে ঘরের এককোণে রাখা একটা পিপে টেনে এনে রান্নাঘরের গালিচার ওপর রাখলো। আমাকে বললো,‘পানি এনে এটা ভর্তি করো!’ আমি দুটো বালতি নিয়ে কুয়ো থেকে পানি এনে পিপেটা ভরতে শুরু করলাম। প্রায় একঘন্টা লাগলো পিপেটা ভরতি করতে,কারণ পিপেটা একটা চৌবাচ্চার মতোই বড়ো ছিলো। এই একঘন্টা ওরা লাগাতার মদ গিলে যাচ্ছিলো। যখন আমি বললাম,‘তোমরা দেখি গলা পর্যন্ত গিলে বসে আছো।’
তখন ব্রুমেঁ বললো,‘চিন্তা কোরো না,আমরা ভালো আছি,তুমি নিজের কাজ শেষ করো। তোমাকেও সুযোগ দেওয়া হবে।’

‘যখন পিপেটা কানায়-কানায় ভরতি হয়ে গেল,তখন ওদের বললাম,‘কাজ শেষ।’
কর্নু আমাকে একশো সৌস বের করে দিলো। ব্রুমেঁ বললো,‘তুমি কি আরো একশো সৌস কামাতে চাও ?’
আমি বিস্ময় চেপে বললাম,‘হ্যাঁ, চাই।’
আমার জবাব শুনে ব্রুমেঁ বললো, ‘তাহলে তোমার কাপড় খুলে ফেলো !’
‘কী ! কাপড় খুলে ফেলবো ?’
‘হ্যাঁ।’
‘সব?’
‘বেশি লজ্জা লাগলে ভেতরের শেমিজটা রাখতে পারো। আমরা রাগকরবো না।’
একশো সৌস কম টাকা নয় যে পথেঘাটে কুড়িয়ে পাওয়া যাবে! তাছাড়া এই দুই অপদার্থের সামনে নগ্ন হতে আমার মোটেও লজ্জা করছিলো না। আমি একেএকে আমার টুপি,জ্যাকেট,স্কার্ট এবং জুতা খুলে ফেললাম। মোজা খুলতে চাইলে ব্রুমেঁ বললো,‘মোজা খোলার দরকার নেই,তুমি ওটা রাখতে পারো, আমরা ভদ্রলোক।’
সায় দিয়ে কর্নুও বললো,‘হ্যাঁ হ্যাঁ,আমরা ভদ্রলোক।’
আর এভাবে প্রায় নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওরা চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়ালো, কিন্তু নেশার প্রভাবে ঠিকমতো খাড়া হতে পারছিলো না।
আমি মনেমনে ভাবলাম,‘ব্যাপারটা কী?’
তখন ব্রুমেঁ কর্নুকে বলল ‘তুমি তৈরি?’
কর্নু বলল ‘হ্যাঁ।’
তারপর তারা দু’জন আচমকা আমাকে ধরে উঠিয়ে নিলো। ব্রুমেঁ আমার মাথা ধরলো,আর কর্নু ধরলো পা। আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম। তখন ধমক দিয়ে ব্রুমেঁ বলল,‘চুপ থাক, বেয়াদ্দপ মেয়েছেলে!’
তাপরপর তারা আমাকে পিপের ভেতর ফেলে দিলো। রক্ত হিম হয়ে গেল আমার। ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো।ব্রুমেঁ বললো,‘খেল খতম?’
কর্নু বললো,‘হ্যাঁ।’
ব্রুমেঁ বললো,‘মাথা তো এখনো বাইরে রয়ে গেছে,মাপতে সমস্যা হবে।’
‘পানিতে চেপে ধরলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়,’ সমাধান বাতলে দিলো কর্নু।
ব্রুমে আমার মাথাটা চেপে ধরলো, যেন সে আমাকে চুবিয়ে মারতে চায়। নাকেমুখে পানি ঢুকে বিষম খেলাম আমি,নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মনে হলো মারা যাচ্ছি। মাথা তুলতে চাইলাম,কিন্তু সে আবার চেপে ধরলো আমার মাথা। প্রাণভয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করলাম ছাড়া পাওয়ার জন্যে। এবার বোধহয় সে ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি আমাকে বাইরে বের করে আনলো, বললো,‘যা, হারামজাদি, কাপড় পরে আয়!’
ভয়ে-আতঙ্কে তখন আমি দিশেহারা। সুযোগ পেয়ে পড়িমরি করে দৌড় দিলাম। একছুটে একেবারে গাঁয়ের ডাক্তারের বাড়িতে। ডাক্তার আমাকে তাড়াতাড়ি তাদের চাকরানির একটা স্কার্ট এনে দিলেন; কারণ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আমি কাপড়চোপড় ছাড়াই পালিয়ে এসেছিলাম। এরপর ডাক্তার গাঁয়ের চৌকিদার মাইত্রে শিকোকে খবর দিতে গেলেন। তারপর শিকো পুলিশ নিয়ে আসলো ক্রিকেতো গিয়ে ।
বাড়ি ফিরে আমরা দেখলাম,দুজনে তখন ঝগড়া করছে। ব্রুমেঁ চিত্কার করছিলোঃ‘এটা ঠিক নয়! এতে কম করেও আরো এক ঘনমিটার পানি ধরবে, আমার কথা শোন,তোর হিসেবে ভুল আছে।
উল্টো কর্নু চেচিয়ে বললো,‘চার বালতি পানিতে আধা ঘনমিটারের বেশি হবে না, তুই চোপা বন্ধ কর,মাথামোটা,আমার হিসেবই ঠিক!’
‘এরপর পুলিশের দারোগা তাদের দুজনকে গ্রেফতার করলো। ব্যস,এটুকুই আমার বলার ছিলো।’
এই বলে সে বসে পড়লো। আদালতে উপস্থিত লোকজন হাসছিলো ওর বক্তব্য শুনে। জুরিরা হতাশ দৃষ্টিতে একে-অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
জজ বললেন,‘বিবাদী কর্নু, মনে হচ্ছে এসব তোমারই শয়তানি! তোমার কিছু বলার আছে এ ব্যাপারে?’
কর্নু উঠে দাঁড়ালো। বললোঃ ‘ধর্মাবতার, আমি তখন নেশায় বুঁদ ছিলাম!’
গম্ভীর হয়ে জজ বললেন,‘তাতো দেখতেই পাচ্ছি,তারপর কী হলো বলো।’
‘জি,বলছি। প্রায় ন’টার দিকে ব্রুমেঁ আমার কাছে আসে। দুই পেগ মদের অর্ডার দিয়ে বলে,‘একটা তোমার জন্যে।’ আমি অবাক হলাম না - কারণ মদ্যপানের ব্যাপারে লোকজন সাধারণত দিলদরিয়া হয় -ওর সাথে বসে টানতে শুরু করলাম। এরপর আমিও তাকে এক পেগ খাওয়ালাম আমার পক্ষ থেকে। সে আবার আমাকে খাওয়ালো। এভাবে চললো প্রায় দুপুর পর্যন্ত, আকন্ঠ মদ গিলে আমরা তখন পুরোপুরি মাতাল।’
‘এরপর ব্রুমেঁ হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলো। ওর কান্না দেখে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কী হয়েছে জানতে চাইলে সে বললোঃ ‘বৃহস্পতিবারের মধ্যে যেভাবেই হোক আমাকে এক হাজার ফ্রাঁ জোগাড় করতে হবে।’ ওর কথা শুনে আমি কিছুটা ঠান্ডা মেরে গেলাম। বুঝতে পারছেন তো,ধর্মাবতার ? এরপর ও হড়বড় করে বললো,‘আমি আমার বউকে বেচে দেবো, কিনবে তুমি?’
‘আমি তখন নেশার ঘোরে,আর আমার বউ মারা গেছে বহুদিন আগে। বুঝতেই পারছেন, ধর্মাবতার, কথাটা শুনে আমি কিছুটা অস্থির হয়ে পড়লাম। আমি তার বউকে কখনো দেখিনি,কিন্তু এটাতো ঠিক যে তার বউ একজন মহিলা,ঠিক কিনা? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,‘কতো হলে তুমি তোমার বউকে বেচবে?’
একথা শুনে সে চমকে উঠলো,অথবা চমকে ওঠার ভান করলো। উত্তরে সে যা বললো তা একজন মাতালই শুধু বলতে পারেঃ‘আমি তাকে ঘনমিটারের হিসেবে বেচবো!’ একথা শুনে আমি মোটেও অবাক হলাম না,কারণ আমি নিজেও তখন বদ্ধ মাতাল,আর একজন মাতালের কাছে কোনোকিছুই অসম্ভব নয়। ঘনমিটারের হিসেব আমি ভালোই বুঝতাম, আমার ব্যবসায় একহাজার লিটার মানে এক ঘনমিটার। তখনো দরদাম হয়নি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,‘এক ঘনমিটারের জন্যে কতো চাও তুমি?’
সে বললো,‘ দুই হাজার ফ্রাঁ। খরগোশের মতো খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম আমি। ভাবলাম এই মহিলা কিছুতেই তিনশো লিটারের বেশি হবে না।
কিন্তু মুখে বললাম,‘দামটা বেশি হয়ে যাচ্ছে না?’
ব্রুমে বললো,‘এর কমে দিতে পারবো না,ভাই, লোকসান হয়ে যাবে!’
‘বুঝতেই পারছেন, ধর্মাবতার,নিজের স্বার্থ একটা মাতালও বুঝতে পারে। কিন্তু সে যদি শুয়োরের মাংস বিক্রিতে সিদ্ধহস্ত হয়, আমি তাকে সুদ্ধু বিক্রি করে দেওয়ার বুদ্ধি রাখি। হা হা হা! তো, আমি তাকে বললাম,‘যদি তোমার বউ নতুন হতো,তাহলে আমার আপত্তি ছিলো না। কিন্তু সে অনেকদিন তোমার বউ ছিলো,অর্থাৎ সে এখন আর আগের মতো খুব একটা তাজা নয়। আমি তোমাকে প্রতি ঘনমিটার পনেরো শ’ ফ্রাঁ করে দেবো, এরবেশি একটাকাও না। রাজি থাকলে বলো।’
সে বললো,‘ঠিক আছে,তা-ই সই!’
এরপর দু’জনে হাত ধরাধরি করে আমরা দোকান থেকে খুশিমনে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু একটা শঙ্কা জাগলো আমার মনে,তাই ব্রুমেকে জিজ্ঞেস করলাম,‘তরল কিছুতে না ঢেলে কিভাবে তাকে তুমি মাপবে?’
‘সে তার পরিকল্পনা জানালো। বললোঃ ‘প্রথমে একটা পিপে নেবো,তারপর পানি দিয়ে সেটাকে কানায়কানায় ভরতি করবো। এরপর তাকে ওটার ভেতর ফেলে দেবো। যেটুকু পানি বাইরে পড়বে,সেটা মেপে নেবো। ব্যস,এভাবে আমরা নিঁখুত মাপ পেয়ে যাবো।’
আমি বললাম,‘বুঝেছি! কিন্তু যে-পানি বাইরে পড়ে যাবে সেটা তুমি মাপবে কিভাবে?’
‘তখন সে আমাকে বোঝাতে শুরু করলোঃ ওর বউকে পিপেতে ফেলার পর যে-পানিটুকু বাইরে পড়বে,পুনরায় সেটা ভরতি করা হবে। যেটুকু পানি ভরা হবে সেটাকে মেপে নেওয়া হবে। অর্থাৎ দশ বালতি পানি ভরলে হবে এক ঘনমিটার। দেখলেন, ব্রুমেঁ আসলে মোটেও বোকা নয় - মদ খেলেই শুধু বুড়ো ঘোড়া হয়ে যায় সে।’তো আমরা তার বাড়িতে পৌঁছলাম। একনজর তার বউকে দেখে বুঝলাম,খুশিতে বগল বাজানোর মতো রূপবতী সে নয়। দেখুন,এখানেই সে আছে। তো,তাকে দেখে মেজাজটা খিঁচড়ে গেলেও,নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে মনেমনে বললাম, সুন্দরী হোক আর বান্দরী,তাতে কী আসে যায়? কাজে তো আসবে! ভালো করে আরেকবার তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, চেহারার মতো শরীরটাও খুব একটা সুবিধের না, একেবারে রোগা-পাতলা। মনেমনে ভাবলামঃ যাক, চারশো লিটারের বেশি হবে না সে মোটেও! মদের ব্যবসা করতে করতে তরল জাতীয় দ্রব্যের হিসাব ভালোই বুঝতাম আমি। এরপর কী ঘটেছে সেটা জানিয়েছে সে আপনাকে। লোকসান হবে জেনেও শেমিজ আর মোজা জোড়া তাকে খুলতে দিইনি,কারণ আমি ভদ্রলোক। একফাঁকে সে পালিয়ে গেল।
আমি ব্রুমেঁকে বললাম,‘ব্রুমেঁ, দেখো সে পালাচ্ছে!’
‘চিন্তা কোরো না,’ বলল সে। ‘আমি তাকে ধরে নিয়ে আসবো। তাছাড়া রাতের বেলা তো তাকে ফিরতেই হবো। এসো আমরা পানিটা মেপে নিই।’এরপর আমরা পানি মেপে নিলাম। চার বালতিও হয় নি। হা হা হা! ’
হাসতে শুরু করলো কর্নু পাগলের মতো । শেষ পর্যন্ত পেছনে দাঁড়ানো সিপাহিরা বাধা দিয়ে তাকে শান্ত করলো। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আবার সে বলতে শুরু করলোঃ ‘তখন ব্রুমেঁ চিত্কার শুরু করলো,‘কিছুই হচ্ছে না, তোমার হিসেবে ভুল আছে!’
আমিও ক্রমাগত চেঁচাতে শুরু করলাম। এরপর সে আমাকে ঘুসি মারলো, আমিও তাকে মারলাম,সে আবার আমাকে মারলো। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত হয়তো আমাদের ঝগড়া চলতে থাকতো, কারণ আমরা দুজনেই ছিলাম বদ্ধ মাতাল। পরে পুলিশ এসে গ্রেফতার করে আমাদের জেলে নিয়ে গেল।’
কর্নু বসে পড়লো। ব্রুমেঁ তার অপকর্মের সহচর কর্নুর সব কথায় সায় দিলো। জুরিরা ফাঁপরে পড়ে গেলেন এই অদ্ভুত মামলার সমাধান করতে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যে তারা আদালতের ভেতরের কক্ষে চলে গেলেন। প্রায় ঘন্টাখানেক পর তারা ফিরে এসে তাদের রায় শোনালেন।
দাম্পত্যজীবনের মাহাত্ম্য, দায়-দায়িত্ব আর ব্যবসায়িক আদান-প্রদানের ন্যূনতম সীমারেখা সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে ব্রুমেঁ আর কর্নুকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হলো।
ব্রুমেঁ তার স্ত্রীকে নিয়ে নিজগৃহে ফিরে গেল।
আর কর্নু ফিরে গেল তার নিজের ব্যবসায়।
.....................

লটারি

মূল: মুনশি প্রেমচাঁদ
রূপান্তর: মোসতাকিম রাহী
.......................................................................................................
আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের জনক মুনশি প্রেমচাঁদের 'লটারি' গল্পটি বাংলায় রূপান্তর করেছিলাম মূল হিন্দি থেকে। প্রকাশিত হয় 'আজকের কাগজ'এর সাহিত্যসাময়িকী 'সুবর্ণরেখা'তে।
......................................................................................................
সংক্ষেপে প্রেমচাঁদ: প্রেমচাঁদের আসল নাম ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম এই কথাশিল্পী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই অবিভক্ত ভারতের বারাণসী জেলার লমহী গ্রামে। উর্দু ভাষায় তাঁর সাহিত্যের হাতে খড়ি, তখন তিনি ‘নবাব রায়’ ছদ্মনামে লিখতেন। ১৯০৭ সালে যখন বৃটিশ সরকার কতৃক তাঁর ‘সজ-এ-বতন’ গল্প সংকলনটি নিষিদ্ধ করা হয়, এবং এর সবকগুলো কপি জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন থেকে তিনি ‘মুনশি প্রেমচাঁদ’ ছদ্মনামে লিখতে শুরু করেন এবং এই নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। অতি অল্প বয়সে প্রেমচাঁদের মা-বাবা মারা যান, ফলে শৈশব কাটে তাঁর দারুণ দারিদ্র্যের মাঝে। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন কৃতিত্বের সাথে। তারপর গ্রামের সরকারি স্কুলে মাসে ১৮ রুপি বেতনে চাকরি নেন। পরে সাব-ডেপুটি ইন্সপেক্টর হিসেবে শিক্ষা বিভাগে কাজ করেন। ১৯২১ সালে গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন। এরপর একটি ছাপাখানা খোলেন, এবং নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘হংস’ নামক সাহিত্য পত্রিকা।সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতে তাঁর দৃপ্ত পদচারণা ছিলো- গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, চিত্রনাট্য কোনো কিছুই বাদ যায় নি। দুইযুগের সাহিত্যিক জীবনে লেখা প্রায় তিনশো ছোটো গল্প আট খন্ডে ‘মানসরোবর’ নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর তেরোটি উপন্যাসের মধ্যে ‘গো-দান’, ‘রঙ্গভূমি’, ‘সেবাসদন’, ‘কর্মভূমি’, ইত্যাদি বিখ্যাত। প্রেমচাঁদ তাঁর গল্পে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করতেন। যে-কারণে চরিত্র অনুযায়ী উর্দু এবং ইংরেজি শব্দের ব্যবহার দেখা যায় তাঁর গল্পে। গি দ্য মপাসাঁ’র গল্পের মতোই সমাজের সবশ্রেণির, সব পেশার মানুষের কথা উঠে এসেছে তাঁর গল্পে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায় তাঁর গল্প এবং উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ১৯৩৬ সালের ১৮ অক্টোবর পরলোক গমন করেন এই কালজয়ী সাহিত্যিক।
........................................................................................................

তাড়াতাড়ি বড়োলোক হতে কে না চায়? আমাদের এখানে যখন প্রথম লটারির টিকেট বিক্রি শুরু হয় তখন আমার বন্ধু বিক্রমের বাবা-মা,চাচা এবং বড়ো ভাই প্রত্যেকে একটা করে টিকেট কেনে। কে জানে কার ভাগ্য খুলে যায়! কারো নামে যদি লটারি লাগে তো টাকাটা ঘরেই রইলো, এই ভেবে একাধিক টিকেট কেনা।
কিন্তু ব্যাপারটা বিক্রমের সহ্য হলো না। অন্যদের নামে লটারি উঠলে তার কী লাভ? খুব বেশি হলে পাঁচ-দশ হাজার টাকা তার হাতে ধরিয়ে দেবে, এই-ই তো! কিন্তু এতো অল্প টাকায় তার কী হবে! তার চায় অঢেল টাকা! জীবনের রঙ-রস উপভোগ করার অনেক স্বপ্ন তার, অনেক পরিকল্পনা আছে। সে সারা পৃথিবীত ঘুরে বেড়াতে চায়,একেবারে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত। পেরু, ব্রাজিল, টিম্বাকটু, হনলুলু এসব জায়গায় যাওয়ার খুব শখ তার। তাও কোথাও গিয়ে দু-একমাস থেকে ফিরে আসা নয়, যেখানেই যাবে লম্বা সময় সেখানে থেকে সেখানকার সংস্কৃতি, রীতি-নীতি পর্যবেক্ষণ করবে। কারণ, বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনযাপনের ওপর বৃহদাকার একটা বই লেখার ইচ্ছে আছে তার। বড়ো একটা লাইব্রেরি খোলার ইচ্ছেও তার আছে, যেখানে থাকবে পৃথিবীর বিখ্যাত সব লেখকের বই। প্রয়োজনে দু’লাখ টাকা খরচ করবে সে লাইব্রেরির জন্যে। বাংলো, গাড়ি আর ফার্নিচারের কথাতো বলাই বাহুল্য!
বাপ-চাচা কারো নামে লটারি লাগলে পাঁচ হাজারের বেশি পাওয়া যাবে না। মায়ের নামে যদি ওঠে হয়তো বিশ হাজার টাকা তিনি দেবেন। কিন্তু বড়ো ভায়ের নামে উঠলে যে এক কানা কড়িও পাওয়া যাবে না, এটা হলফ করে বলা যায়। খুব অভিমান হলো বিক্রমের। নিজের বাপ-ভায়ের কাছ থেকেও সাহায্য কিংবা দান-খয়রাত হিসেবে কিছু নেওয়া তার কাছে অপমানজনক মনে হলো। কথায় আছে, কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে কুয়োর পানিতে ডুবে মরা অনেক ভালো। কেউ যদি সংসারে নিজের স্থান তৈরি করতে না পারে, তো সংসার ত্যাগ করা-ই তার উচিৎ।
বিক্রম বেকার মানুষ, লটারির টিকেট কেনার জন্যে কে ওকে টাকা দেবে! অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সে আমাকে বললো, ‘আচ্ছা আমরা দু’জনে মিলে লটারির টিকেট কিনলে কেমন হয়?’
ওর প্রস্তাব আমার পছন্দ হলো। আমি তখন একটা স্কুলে মাস্টারি করি। মাসে বিশ টাকা মাইনে পাই। কোনোমতে খেয়েপরে দিন যাপন করি। আমার মতো মানুষের দশটাকা খরচ করে লটারির টিকেট কেনা আর হাতি কেনা একই কথা। হ্যাঁ, লটারি পেয়ে গেলে সেই টাকা কোথাও খাটিয়ে কিংবা ব্যাংকে রেখে নিশ্চিন্তে খাওয়া-পরা চলতে পারে। মাসে চার হাজার টাকা যদি আসে, জনের ভাগে দুই হাজার করে মন্দ নয়।
বিক্রমকে বললাম, ‘আমারতো মনে হয় দু’হাজার টাকায় তুমি আরামসে চলতে পারবে।
উত্তেজিত হয়ে বিক্রম বললো,‘ ভিখারির মতো আমি থাকতে পারবো না, আমি রাজার হালে থাকতে চাই।’
‘দু’হাজার টাকায় সেটা তুমি সহজেই পারো।’
‘কিন্তু তুমি তোমার হিস্যা থেকে আমাকে দু’লাখ টাকা না দিলে আমি তো লাইব্রেরি বানাতে পারবো না।’
‘এটাতো অপরিহার্য নয় যে, তোমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে লাইব্রেরি বানাতে হবে।’
‘আমার লাইব্রেরিকে অবশ্যই অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে।’
‘এটা তুমি দাবি করতে পারো। কিন্তু আমার ভাগের টাকা থেকে তোমাকে আমি কিছুই দিতে পারবো না। আমার প্রয়োজনটা দেখো, তোমাদের অনেক সয়-সম্পত্তি আছে। তোমার ওপর তেমন কোনো দায়িত্বও নেই। কিন্তু আমার ওপর পুরো সংসারের বোঝা। দুই বোনের বিয়ে দিতে হবে, ভাইদের লেখাপড়া করাতে হবে। একটা বাড়ি তৈরি করতে হবে। আমিতো টাকাগুলো সোজা ব্যাংকে রেখে দেবো। তা থেকে যা সুদ আসবে সেটা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেবো। এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেবো, যাতে আমার অবর্তমানে কেউ অই টাকায় হাত লাগাতে না পারে।’
বিক্রম সহানুভুতির সুরে বললো,‘ ঠিক বলেছো, এই অবস্থায় তোমার কাছ থেকে কিছু চাওয়াটা অন্যায়। যাক, আমিই কোনো একটা ব্যবস্থা করে নেবো। কিন্তু একটা ব্যাপার কি খেয়াল করেছো, ব্যাংকের সুদের হার তো আজকাল অনেক কমে গেছে।’
আমরা বেশ কয়েকটা ব্যাংকে গিয়ে তালাশ করলাম। আসলেই সুদের হার খুব কম দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। শতকরা দু’-আড়াই টাকা সুদে টাকা ফেলে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তারচেয়ে সুদে টাকা ঋণ দেওয়া শুরু করলে কেমন হয়? বিক্রমও সফরে যাবে না, দু’জন মিলে কারবার দাঁড় করে ফেলতে পারবো। কিছু অর্থ হাতে এসে গেলেই বিক্রম সফরে যাবে। লেনদেনের ব্যবসায় সুদও পাওয়া যাবে প্রচুর। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত কারো জন্যে বিশ্বস্ত জামানত পাওয়া না যাবে, তাকে ঋণ দেওয়া হবে না। সে যতো সম্মানী মানুষই হোক না কেন। অবশ্য এর চেয়ে সম্পত্তির দলিল দস্তাবেজ রেখে টাকা দিলে আরো ভালো হয়, কোনো খটকা থাকবে না।যাক, টাকা খাটানোর রাস্তা তো ঠিক হলো। এখন টিকেটে কার নাম থাকবে সেটা হলো কথা। বিক্রমের নাম থাকবে, নাকি আমার? বিক্রম তার নাম লেখানোর আগ্রহ দেখালো। যদি তার নাম না থাকে টিকেটই কিনবে না সে। কোনো উপায় না দেখে আমি মেনে নিলাম। কোনোরকম লেখাজোকা না করেই, যে-কারণে পরে আমার সমস্যা হয়েছিলো।
শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর গোনা, কবে টিকেট কিনবো! সকালে ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই আমার চোখ চলে যেতো ক্যালেন্ডারের পাতায়। বিক্রমের বাড়ি আর আমার বাড়ি ছিলো পাশাপাশি। স্কুলে যাওয়ার সব খরচ বাঁচিয়ে পাঁচটাকা কোনোরকমে যোগাড় করা যায়। তারপরও ভাবতাম, যদি কিছু বাড়তি টাকা অন্য কোনোভাবে জোগাড় করা যেতো তাহলে খুবই ভালো হতো!
বিক্রম বললো,‘আচ্ছা, আমার আঙটিটা বেচে দিলে কেমন হয়? বাড়িতে বলবো যে হারিয়ে গেছে!'
আঙটিটা দশটাকার কম হবে না। অই টাকা দিয়ে সহজেই টিকেট কেনা যায়। যদি কোনোরকম খরচ ছাড়াই টিকেটের অর্ধেক ভাগ পাওয়া যায় তাহলে মন্দ কী! কিন্তু আমার মতলব বোধহয় টের পেয়ে গেলো বিক্রম। বললো,‘পাঁচটাকা তোমাকে টিকেট কেনার আগেই নগদ দিতে হবে। তা না হলে আমি কিন্তু নেই।’
ওর কথা শুনে আমার ভেতর ন্যায়বোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। বললাম,‘ এটা কিন্তু ঠিক হবে না, কেউ যদি বুঝতে পারে যে তুমি আঙটি বেচে দিয়েছো, তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! তোমার সাথে আমাকেও অপমানিত হতে হবে।’
শেষ পর্যন্ত স্থির হলো আমাদের পুরোনো পাঠ্যবই বিক্রি করে সেই টাকায় টিকেট কেনা হবে। এই মুহূর্তে লটারি কেনার চেয়ে দরকারি কাজ আর কিছু নেই। আমি আর বিক্রম একসাথে মেট্রিক পাস করেছি। কিন্তু যখন দেখলাম কষ্ট করে যারা লেখাপড়া করে ডিগ্রি হাসিল করছে, তাদের চেয়ে গন্ডমূর্খরা বেশ ভালো আছে, তখন দু’জনে লেখাপড়া বন্ধ করে দিলাম। আমি যোগ দিলাম ইস্কুলের শিক্ষক হিসেবে আর বিক্রম গেরস্থালি করতে লাগলো। আমাদের বইগুলো এখন উইয়ের খাদ্য হওয়া ছাড়া আর কোন্ কাজেই বা আসবে! গোলাঘরের এককোণে বইগুলো ফেলে রেখেছিলাম, বের করে সেগুলো ঝাড়ামোছা করে একটা বড়ো গাঁটরি বাঁধলাম দু’জনের গুলো মিলিয়ে। ইস্কুলমাস্টার হিসেবে সবাই আমাকে চেনে। তাই কোনো দোকানে গিয়ে বইগুলো বেচতে লজ্জা লাগছিলো। বাধ্য হয়ে বিক্রমকেই এই মহৎ কর্মটি সাধনের ভার দেওয়া হলো। আর সে মাত্র আধঘন্টার ভেতর দশটাকার একটা নোট হাতে নাচতে নাচতে আমার কাছে ফিরে এলো। এতো খুশি তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। বইগুলো যদিও চল্লিশটাকার কম হবে না, কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের কাছে মনে হচ্ছিলো দশটাকা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি। এই টাকায় অর্ধেক ভাগ পাওয়া যাবে টিকেটের। দশলাখ টাকার পুরস্কার। পাঁচলাখ আমার, পাঁচলাখ বিক্রমের। এই দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলাম আমরা দু’জন।
‘পাঁচলাখ কিন্তু কম টাকা নয়, বিক্রম,’ প্রসন্নচিত্তে ওকে বললাম। বিক্রম আমার মতো খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলো না। বললো, ‘পাঁচলাখ কেন, এই মুহূর্তে পাঁচশো টাকাও আমার জন্যে অনেক। কিন্তু বহুবছরের স্বপ্ন-পরিকল্পনা বাদ দেওয়া কি এতোই সোজা! তবুও প্রোগ্রাম বদলাতে হবে। লাইব্রেরি গড়ার পরিকল্পনা বাদ, কিন্তু বিশ্বভ্রমণ তো আমাকে করতেই হবে।’
আমি আপত্তি করলাম,‘তুমি দু’লাখ টাকায় তো তোমার বিশ্বভ্রমণ শেষ করতে পারো!’
‘জি না, ওটার জন্যে বাজেট হলো সাড়ে তিনলাখ টাকা। বছরে পঞ্চাশ হাজার করে সাত বছরের প্রোগ্রাম।’

প্রতিদিন ইস্কুল থেকে ফেরার পর আমরা দু’জন একসাথে বসে এভাবে আমাদের স্বপ্ন রচনা করতাম। কথা বলতাম নিচুস্বরে, যাতে কেউ আমাদের কথা শুনতে না পায়। কারণ লটারির টিকেট কেনার রহস্য আমরা গোপন রাখতে চাইছিলাম। সত্যি সত্যি যদি লটারি লেগে যায় তাহলে লোকজন কী পরিমাণ অবাক হবে সেটা ভেবে ভীষণ আমোদ হতে লাগলো আমাদের। এখন সবাইকে টিকেট কেনার কথা বলে দিলে সেই মজাটা আর পাওয়া যাবে না।একদিন প্রসঙ্গক্রমে বিয়ের কথা উঠলো। বিক্রম দার্শনিকের মতো ভাব নিয়ে গম্ভীরগলায় বললো,‘ভাই, এসব বিয়ে-শাদির যন্ত্রণা সহ্য করা আমার কম্মো নয়! মেয়েছেলে মানেই ঝামেলা! বউয়ের খাই মেটাতে মেটাতে জীবন শেষ হয়ে যাবে।’
আমি তার সাথে একমত হতে পারলাম না। বললাম,‘বিয়ের পর খরচ একটু বাড়বে তা ঠিক, কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত দুঃখ-কষ্টের ভাগ নেওয়ার জন্যে একজন সঙ্গিনী না আসে তাহলে জীবনের মজাইতো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমি বিয়ে-শাদির বিপক্ষে নই। হ্যাঁ, এটা অবশ্য ঠিক এমন একজন সাথি দরকার যে সারাজীবন সঙ্গে থাকবে। এমন সাথি একমাত্র স্ত্রী ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।’
বিক্রম খেপে গেলো আমার কথায়। ‘তুমি থাকো তোমার মতো! কুকুরের মতো বউয়ের পেছন-পেছন ঘোরো, আর বাচ্চাকাচ্চার ক্যাঁওম্যাঁও কে ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করে খুশিমনে জীবন যাপন করো। তোমাকে অভিনন্দন! আমি থাকবো স্বাধীন, মুক্তবিহঙ্গের মতো। যখন যেখানে মন চায় চলে যাবো, যা মন চায় করবো। ইচ্ছে হলো বাড়ি ফিরবো, নয়তো ফিরবো না। পাহারাদারের মতো সারাক্ষণ একজন খবরদারি করবে এটা আমি সহ্য করতে পারবো না। বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই জবাব চাইবে:‘কোন চুলোয় গিয়েছিলে এতোক্ষণ,অ্যাঁ?’ আর খুশিমনে হয়তো কোথাও যেতে বের হলাম তখন বাধা দিয়ে বলবে:‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে মিনসের শুনি!’ দুর্ভাগ্যক্রমে যদি সেও সঙ্গী হয়, তাহলে তো কেল্লাফতে, পানিতে ডুবে মরা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকবে না!‘ভাই, তোমার প্রতি আমি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাতে পারছি না। বাচ্চার সামান্য সর্দি-কাশি হলে অস্থির হয়ে দৌড়ে যাও হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে। আর একটু বয়স হয়ে গেলে ছেলেরা মনেমনে চাইবে কখন তুমি পটল তুলছো, যাতে তারা ইচ্ছেমতো চলতে পারে। সুযোগ পেলে তোমাকে বিষ খাইয়ে মারবে, আর প্রচার করবে তোমার কলেরা হয়েছিলো। এই ঝামেলায় আমি নেই, ভাই।’
এমন সময় কুন্তি এলো। বিক্রমের ছোটো বোন। বছর এগারো হবে বয়স, ষষ্ঠশ্রেণিতে পড়ে, আর পরীক্ষায় নিয়মিত ফেল মারে। ভীষণ দুরন্ত আর বেয়াড়া মেয়ে। এতো জোরে সে দরোজা খুললো যে, চমকে গিয়ে আমরা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বিক্রম রেগে গিয়ে বললো,‘অ্যাই বুড়ি শয়তান, কে বলেছে তোকে এখানে আসতে, অ্যাঁ?’
গোয়েন্দা পুলিশের মতো কুন্তি ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বললো, ‘তোমরা সারাক্ষণ কেবাড় বন্ধ করে এই ঘরে করোটা কী? যখনই আসি দেখি এখানে বসে আছো। কোথাও ঘুরতে যাও না, আড্ডা দিতে যাও না। কী মন্ত্র জপতে থাকো সারাক্ষণ দু’জনে মিলে?’
বিক্রম কুন্তির ঘাড় চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো,‘হ্যাঁ, একটা মন্ত্র জপছি, যাতে তাড়াতাড়ি তোর জন্যে একটা বর পাওয়া যায়, যে তোকে প্রতিদিন গুনে গুনে পাঁচটি চাবুক মারবে।’
‘এমন স্বামীকে বিয়ে করতে আমার বয়েই গেছে,’ নাক ফুলিয়ে জবাব দিলো কুন্তি। ‘আমি এমন কাউকে বিয়ে করবো যে আমার সামনে সবসময় মাথা নিচু রাখবে। আমি যা বলবো তা-ই করবে,আমার কথার অবাধ্য হবে না। মা বলেছেন লটারির পুরস্কার থেকে তিনি আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবেন। ব্যস, ঐ টাকায় ফূর্তি করবো। আমি তো দুই বেলা ঠাকুরের কাছে মায়ের জন্যে প্রার্থনা করি। মা বলেছেন, কুমারী মেয়েদের প্রার্থনা কখনো নিষ্ফল হয় না। আমার মন বলছে মা অবশ্যই লটারির পুরস্কারটা পাবেন।’
কুন্তির কথা মিছে নয়। আমার মনে পড়লো একবার নানাবাড়ি গিয়েছিলাম গ্রামে। তীব্র দাবদাহে চারিদিক শুকিয়ে মরুভূমি প্রায়। সামান্য বৃষ্টির জন্যে হাহাকার করছে সবাই। তখন গ্রামের সবাই চাঁদা তুলে একটা ভোজের আয়োজন করে যতো কুমারী মেয়ে আছে সবাইকে নিমন্ত্রণ করলো। আর ঠিক তিনদিনের মাথায় নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। কুমারী মেয়েদের আশীর্বাদে যে কাজ হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই।আমি বিক্রমের দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করলাম। সে আমার ইশারা বুঝতে পারলো। চোখেচোখে দু’জনে পরামর্শ করে নিলাম। বিক্রম কুন্তিকে বললো,‘আচ্ছা তোকে একটা কথা বললে কাউকে বলবি নাতো? না না, তুই খুব লক্ষ্মী মেয়ে, আমি জানি তুই কাউকে বলবি না। এখন থেকে আমি তোকে ভালো মতো পড়াবো, এবার তুই ঠিকই পাশ করতে পারবি। আসলে হয়েছে কী, আমরা দু’জনেও একটা লটারি কিনেছি। তুই ঈশ্বরের কাছে আমাদের জন্যেও একটু প্রার্থনা করিস, বোন। যদি লটারি পেয়ে যাই তাহলে তোকে সুন্দর সুন্দর গয়না গড়িয়ে দেবো। সত্যি বলছি!’
কিন্তু কুন্তি বিশ্বাস করলো না বিক্রমের কথা। আমরা দু’জনে শপথ করলাম। তারপরও সে শয়তানি করতে লাগলো। শেষমেশ কসম খেয়ে যখন বললাম তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সোনা আর হিরে দিয়ে মুড়ে দেবো, তখন সে রাজি হলো আমাদের জন্যে প্রার্থনা করতে। কিন্তু তার পেটে যে এই সামান্য কথা হজম হবে না সেটা আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারি নি। সে সোজা ভেতরে গিয়ে কথাটা মুহূর্তের মধ্যে রাষ্ট্র করে দিলো। শুরু হলো বকাবকি। মা-বাবা-চাচি যে-ই সামনে পাচ্ছে সে-ই দিচ্ছে বকুনি: কী দরকার ছিলো টাকা খরচ করার? নিশ্চয়ই মাস্টার এই বুদ্ধি দিয়েছে! এতোগুলো টাকা পানিতে ফেলে দিলি! বাড়িতে কতোজনে টিকেট কিনেছে, তোর কী প্রয়োজন ছিলো কেনার! ওরা পুরস্কার পেলে সেখান থেকে কি তোকে ভাগ দিতো না! এরপর শুরু হলো আমাকে ধোলাই:‘আর তুমিও মাস্টার, একটা অপদার্থ! ছেলেমেয়েদের ভালো কিছু শেখাবে কি, উল্টো তাদের কুমন্ত্রনা দিচ্ছো!’
বিক্রম আদরের ছেলে, তাকে বেশি আর কী বলবে! রাগ করে দু’-এক বেলা খাওয়া বন্ধ করে দিলেই সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে, উল্টো তাকে সাধাসাধি করতে করতে সবার জান বেরিয়ে যাবে। সবার রাগ এসে পড়লো আমার ওপর। ‘এই মাস্টারের সহচর্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা!’ সবাই রায় ঘোষণা করলো।ছোটোবেলার একটা ঘটনা মনে পড়লো আমার। আমিও বিক্রমের মতো কৌশল অবলম্বন করে একবার বেঁচে গেছিলাম মারের হাত থেকে। সেবার দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে একটা মদের বোতল আনা হয়েছিলো বাড়িতে। মামু অই সময় বেড়াতে এসেছিলেন আমাদের ওখানে। আমি করলাম কী, চুপিচুপি ভাঁড়াড়ে ঢুকে একটা গেলাসে করে কিছুটা শরাব নিয়ে খেয়ে ফেললাম। গলা জ্বলতে শুরু করলো, আর চোখ হয়ে গেলো টকটকে লাল। এমন সময় হঠাৎ কোত্থেকে মামু এসে হাজির হলেন। ধরে ফেললেন হাতেনাতে। আর এতোটা রেগে গেলেন তিনি যে, ভয়ে আমার কলজে শুকিয়ে গেলো। মা-বাবা সবাই মিলে বকাবকি শুরু করলেন। ভয়ে যখন আমি কাঁদতে শুরু করলাম, তারা শান্ত হলেন। আর সেদিন দুপুরে মামু বেহেড মাতাল হয়ে গান গাইতে লাগলেন। এরপর শুরু হলো হলো মড়াকান্না, তারপর মাকে গালাগালি করলেন, আর দৌড়ে দাদুকে গেলেন মারতে । শেষে বমি করতে করতে একসময় মাটিতে পড়ে গেলেন অজ্ঞান হয়ে।
বিক্রমের বাবা বড়ো ঠাকুর সাহেব এবং চাচা ছোটো ঠাকুর সাহেব দু’জনেই ছিলেন জড়বাদী। পূজা-অর্চনায় তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিলো না, বরং হাসি তামাশা করতেন তা নিয়ে: পুরোপুরি নাস্তিক। কিন্তু এখন দেখলাম দু’জনেই খুব ঈশ্বর ভক্ত হয়ে উঠেছেন। বড়ো ঠাকুর সাহেব তো সকালে উঠেই চলে যান গঙ্গাস্নান করতে। আর পুরোটা সকাল মন্দিরে কাটিয়ে দুপুরবেলা সারা শরীরে চন্দন ঘষে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আর ছোটো ঠাকুর তো গরমজলে স্নান করার সময়ও রামনাম জপতে থাকেন। এরপর চলে যান পার্কে, সেখানে গিয়ে চড়ুই-কবুতরদের দানা খাওয়ান পরম আদরে।সন্ধ্যার সময় দু’ভাই বাড়ি ফিরে চলে যান ঠাকুরঘরে। তারপর প্রায় অর্ধেক রাত পর্যন্ত শোনেন ভগবত গীতার শ্লোক।
বিক্রমের বড়ো ভাই প্রকাশ সাধু-সন্ন্যাসীদের ওপর অগাধ আস্থা রাখে। প্রায়ই চলে যায় সে তাদের আস্তানায়, মঠে। সেখানকার ধুলোময়লা সাফ করে, আর দেবি মায়ের সেবায় লেগে থাকে সবসময়। লোকে বলে লোভ-লালসা ভালো নয়,পাপ; কিন্তু আমার মনে হয় এই যে আমরা ধর্মকর্ম করছি, দেবদেবির পূজা করছি, ব্রত পালন করছি, সবকিছুই কিছু না কিছু পাওয়ার লোভে। আমাদের ধর্ম, আমাদের বিশ্বাস টিকে আছে স্বার্থসিদ্ধির গোপন আকাঙ্ক্ষার ওপর। লোভ যে মানুষের চরিত্র, মন-মানসিকতা আমূল বদলে দিতে পারে, এটা আমার জন্যে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।আস্তে-আস্তে যতোই লটারির ফলাফল ঘোষণার দিন ঘনিয়ে আসতো লাগলো ততোই আমাদের মানসিক শান্তি উবে যেতে লাগলো। সারাক্ষণ ঐ চিন্তায় শুধু মাথায় ঘোরে। মাঝেমাঝে নিজের ওপর আমার অকারণে রাগ হতে থাকলো যে, বিক্রম যদি আমাকে লটারির ভাগের টাকা না দেয় তাহলে আমি কী করবো! যদি সে অস্বীকার করে যে লটারিতে আমার কোনো ভাগ নেই, তাহলে? আমার কাছে তো কোনো সাক্ষীসাবুদ, প্রমাণপত্র কিছু নেই। সবকিছু নির্ভর করছে বিক্রমের মর্জির ওপর। ওর মনে যদি বদ মতলব থাকে তাহলেই সেরেছে! কিছুতেই আমি দাবি করতে পারবো না যে, লটারিতে আমারও ভাগ আছে। টুঁ শব্দও করতে পারবো না, করলেও কোনো লাভ হবে না। যদি তার মনে কুমতলব থাকে তাহলে সেটা এখনই বোঝা যাবে, আর যদি তা না থাকে তবে আমার সংকীর্ণতার কথা জানতে পেরে খুব আঘাত পাবে।
আমি জানি, বিক্রম মোটেও এরকম নয়; কিন্তু ধনদৌলত হাতে এলে ক’জনাই বা ঈমান ঠিক রাখতে পারে! এখনো তো টাকা হাতে আসে নি, ঈমানদার সাজতে অসুবিধে কী! পরীক্ষার সময় তো আসবে তখন,যখন দশলাখ টাকা হাতে আসবে। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, যদি টিকেট আমার নামে হতো, তাহলে আমি কি বিক্রম কে এতো সহজে পাঁচলাখ টাকা দিয়ে দিতাম? হয়তো বলতাম, ‘তুমি আমাকে পাঁচটাকা ধার দিয়েছিলে, তার বদলে দশটাকা নাও, একশো টাকা নাও, আর কী করবে!’ কিন্তু না, এরকম অমানুষ আমি হতে পারবো না।পরদিন আমরা পত্রিকা দেখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বিক্রম বললো, ‘যদি সত্যি সত্যি এখন লটারির পুরস্কারটা আমাদের নামে ওঠে, তাহলে আমার আফসোস হবে এই ভেবে যে, কেন শুধু শধু তোমার সাথে মিলে টিকেট কিনলাম!’ মুচকি হেসে সরল ভাবে কথাটা সে বললো। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম, এটা তার মনের প্রকৃত ছবি, যা দুষ্টুমির আড়ালে লুকোতে চাইছে সে।
আমি চমকে উঠে বললাম, ‘সত্যি! কিন্তু এই একই রকম অনুভূতি তো আমারও হতে পারে!’
‘কিন্তু টিকেট তো আমার নামে নেওয়া হয়েছে।’
‘তাতে কী?’
‘মনে করো, তুমিও যে টিকেটর ভাগিদার সেটা আমি অস্বীকার করলাম!’
মেরুদন্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো আমার। দু’চোখে আঁধার দেখলাম।‘কিন্তু আমি তোমাকে বদলোক মনে করি না,’ ফ্যাকাসে হেসে বললাম।
‘ঠিক, কিন্তু শয়তান সওয়ার হতে কতোক্ষণ! ভেবে দেখো, পাঁচলাখ! খুব কম টাকা নয় কিন্তু! মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট।’
‘তো ঠিক আছে, এখনো সময় আছে, লেখাজোকা করে নিলেই হয়! আর কোনো সংশয় থাকবে না।’
বিক্রম হেসে বললো,‘তুমি বড়ো সন্দেহ বাতিক লোক,দোস্ত। আমি তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম। আমি কি কখনো তোমাকে ধোঁকা দিতে পারি! পাঁচলাখ কেন, পাঁচকোটি টাকাও যদি হয়্, আমার মনে কখনো খারাপি আসবে না, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকো।’
কিন্তু তার এই আশ্বাস বাণী আমি মোটেও বিশ্বাস করতে পারলাম না। সন্দেহের যে-পোকা মনে ঢুকেছে, সেটা শুধু কেটেই চলেছে। আমি আবার বললাম, ‘এটা আমি খুব ভালো করেই জানি যে, তোমার মনে কোনো কলুষতা নেই, কিন্তু লেখাজোকা করে নিলে ক্ষতি কী!’
‘কী দরকার অযথা!’
‘অযথাই না হয় করলাম।’
‘করলে পাকা দলিলই করতে হবে। আর তাতে দশলাখ টাকার হিসেবে কোর্টের ফিস আসবে প্রায় সাড়ে সাত হাজার। কোনো প্রয়োজন আছে এতোগুলো টাকা জলে ফেলার!’
আমি মনে মনে ভাবলাম, শাদা কাগজে লিখে নিলে কেমন হয়? এটা হয়তো ঠিক যে, শাদা কাগজের লেখা দিয়ে আমি আইনের আশ্রয় নিতে পারবো না। কিন্তু সমাজের সামনে, লোকজনের সামনে তাকে ধোঁকাবাজ প্রমাণ করতে,তাকে লজ্জিত করতে তো পারবো। আর লোকনিন্দার ভয় কার নেই! লোকজনের সামনে অপমানিত হওয়ার ভয়, আইনের সাজার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
‘শাদা কাগজে করলেও আমার কোনো আপত্তি নেই, ’বললাম আমি।
বিক্রম হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললো, ‘যে-কাগজের কোনো আইনি মূল্য নেই, সেটা করে কী লাভ?’
আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, বিক্রমের মনে শয়তানি আছে। নয়তো একটা শাদা কাগজে লিখতে অসুবিধে কী? রেগে গিয়ে বললাম, ‘তোমার মাথায় এখন থেকেই বদ মতলব ঘুরপাক খাচ্ছে।’
নির্লজ্জের মতো সে বললো,‘ তুমি বলতে চাইছো, এই অবস্থায় তোমার খেয়াল খারাপ হতো না?’
‘মোটেও না, আমি এতো নীচ নয়।’
‘আরে রাখো, কী আমার সজ্জন লোক রে! কতো দেখলাম তোমার মতো ভালো মানুষ!’
‘ এক্ষুনি তোমাকে কাগজে লিখে দিতে হবে। তোমার ওপর আমার আর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই।’
‘আমার প্রতি যদি তোমার আস্থা না থাকে তাহলে আমিও কোনো লিখিত কাগজ দেবো না।’
‘আচ্ছা! তো তুমি মনে করেছো আমার টাকা খেয়ে হজম করতে পারবে?’
‘কিসের টাকা তোমার, কেমন টাকা?’
‘দেখো বিক্রম, শুধু বন্ধুত্বই নষ্ট হবে না, তারচেয়েও ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে বলে দিচ্ছি!’ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলো আমার ভেতরে।এমন সময় হঠাৎ করে বৈঠকখানা থেকে ঝগড়ার আওয়াজ ভেসে আসায় আমার মনোযোগ সেদিকে চলে গেলো। সেখানে দুই ঠাকুর সব সময় বসে আড্ডা দেন। তাদের মধ্যে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো, যেটা শুধু দুই আদর্শ ভাইয়ের মধ্যে হতে পারে। একেবারে মানিকজোড়, ঠিক যেন রাম-লক্ষ্মণ! ঝগড়া দূরে থাকুক তাদের মধ্যে কখনো সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে বলেও আমি শুনিনি। বড়ো ঠাকুর যা বলবেন ছোটো ঠাকুর তা মাথা পেতে নেবেন, আর ছোটো ঠাকুরের ইচ্ছে অনিচ্ছের প্রতি সম্মান দেখিয়েই বড়ো ঠাকুর কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন। আমরা দুজন খুব অবাক হয়ে গেলাম এই বন্ধুপ্রতিম দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে বুঝতে পেরে। চুপিচুপি বৈঠকখানার দরোজায় গিয়ে দাঁড়ালাম দু’জন।

দুই ভাই ইতোমধ্যে নিজেদের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। চোখ লাল, হাতজোড়া মুঠি পাকানো, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে একজন আরেকজনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। বোঝা যায় শুধু হাতাহাতিটাই বাকি আছে।ছোটো ঠাকুর বিক্রমকে দেখতে পেয়ে বললো, ‘যৌথ পরিবারে যা কিছু আসুক, যেখান থেকে আসুক, যার নামেই আসুক না কেন, সেটা সবার নামে সমান ভাগে হিসাব হবে।’
বিক্রমের বাবাও বিক্রমকে দেখতে পেয়েছে। এক কদম সামনে এগিয়ে এসে বিক্রমের বাবা, অর্থাৎ বড়ো ঠাকুর বললেন, ‘মোটেও না, আমি যদি কোনো অপরাধ করি তাহলে পুলিশ আমাকে এসে ধরবে, যৌথ পরিবারকে নয়। শাস্তি আমি পাবো যৌথ পরিবারের কেউ পাবে না। এটা ব্যক্তিগত হিসাব।’
‘ঠিক আছে, এর ফয়সালা আদালতেই হবে।’
‘যাও, খুশিমনে আদালতে যাও। যদি আমার বউ ছেলে কিংবা আমার নামে লটারি ওঠে তাহলে তাতে তোমার কোনো অংশ থাকবে না। ঠিক তেমনি যদি তোমার নামে লটারি ওঠে তাহলে তাতে আমাদের কারো দাবি থাকবে না।’
‘যদি জানতাম, আপনার মনে কুমতলব আছে তাহলে আমিও আমার বউ-বাচ্চার নামের টিকেট কিনতে পারতাম।’
‘ওটা তোমার বোকামি!’
‘হ্যাঁ, কারণ আপনি আমার বড়ো ভাই, বিশ্বাস করেছিলাম আপনাকে।'
‘এটা হচ্ছে একধরনের জুয়াখেলা, তোমার বোঝা উচিৎ। জুয়ার হারজিতের সাথে পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই, থাকতে পারে না। তুমি যদি কাল রেসের বাজিতে পাঁচ-দশ হাজার টাকা হেরে যাও তোমার পরিবার তো তার জন্যে দায়ী হতে পারে না।’
‘ভাইয়ের হক খেয়ে আপনি সুখী হতে পারবেন না।’
‘শকুনের প্রার্থনায় কি আর গরু মরে ভাই!’

বিক্রমের মা ভেতর থেকে দৌড়ে এলেন দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া লেগেছে শুনে। এসে দু’জনকে বোঝাতে লাগলেন। ছোটো ঠাকুর রেগেমেগে বললেন,‘আমাকে নয়, তুমি তাঁকে বোঝাও। আমি তো একটা মাত্র টিকেট কিনেছি, তার কোনো ভরসা নেই। উনি চার চারটি টিকেট কিনে বসে আছেন। আমার চেয়ে লটারি পাওয়ার চান্স তাঁর চারগুন বেশি। এরপরও যদি তার খেয়াল খারাপ হয়ে যায়, এরচেয়ে লজ্জার, দুঃখের কথা আর কী হতে পারে!’
ঠাকরুন দেবরকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ আচ্ছা ঠিক আছে, আমার টাকা থেকে আমি তোমাকে অর্ধেক দিয়ে দেবো। খুশি তো?’
বড়ো ঠাকুর বউয়ের কথা শুনে ধমক দিয়ে উঠলেন, ‘কেন অর্ধেক দেবো, কোন হিসেবে দেবো? আমরা যদি ভালো মানুষি দেখিয়ে দেইও, সে পাবে পাঁচভাগের এক ভাগ। কোন যুক্তিতে তাকে অর্ধেক দেবো শুনি? ধর্মমতে বলো আর আইনমতে বলো।’
ছোটো ঠাকুর মুখ ভেংচে বললেন, ‘হ্যাঁ, দুনিয়ার যাবতীয় আইনতো সব আপনিই জানেন!’
‘নয়তো কী, ত্রিশবছর ধরে ওকালতি করছি!’
‘ওকালতি সব বেরিয়ে যাবে যখন কলকাতার ব্যারিস্টার এনে সামনে দাঁড় করিয়ে দেবো।’
‘কলকাতার হোক আর লন্ডনের, আমি থোড়াই কেয়ার করি।’
‘অর্ধেক ভাগ আমি নেবোই। সম্পত্তিতে যেমন আমার অর্ধেক অংশ আছে লটারিতেও আমার অর্ধেক চায়।’

এমন সময় বিক্রমের বড়ো ভাই প্রকাশ হাতে মাথায় ব্যান্ডেজ, আর দোমড়ানো মোচড়ানো কাপড়চোপড়ে তাজা রক্তের দাগ নিয়ে একেবারে হাসিমুখে এসে আরামকেদারায় ধপাস করে বসে পড়লো। বড়ো ঠাকুর ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘এ কী হয়েছে তোর? চোট পেলি কী করে? কারো সাথে মারপিট করে আসছিস না তো?’
প্রকাশ আরামকেদারায় শোয়া অবস্থায় সামান্য আড়মোড়া ভেঙে বললো,‘জি না, ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই, আমার কিছু হয় নি, আমি ভালো আছি।’
‘কী বলছিস কিছু হয় নি! মাথা আর হাতে চোট লেগে রক্ত বেরুচ্ছে! ব্যাপারটা কী, রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা হয়নি তো!’
‘একেবারে মামুলি আঘাত, বাবা, দু’-একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। ভয়ের কিছু নেই।’প্রকাশের ঠোঁটে মুচকি হাসি। আশ্চর্য শান্ত তার হাবভাব। রাগ কিংবা অপমানের কোনো চিহ্ন তার চেহারায় নেই। প্রতিশোধ নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার মধ্যে দেখা যাচ্ছিলো না। বড়ো ঠাকুর অস্থির হয়ে গেলেন তার আচরণে। বললেন,‘কিন্তু কী হয়েছে সেটা বলছিস না কেন? কেউ মারধোর করে থাকলে বল, থানায় গিয়ে রিপোর্ট করে আসি।’
প্রকাশ হালকা মেজাজে বললো, ‘মারপিট কারো সাথে হয় নি, বাবা। তুফান বাবার আস্তানায় গিয়েছিলাম একটু। আপনি তো জানেন, উনি লোকজন দেখলেই পাথর নিয়ে তাড়া করেন। আর ভয় পেয়ে যদি কেউ দৌড় দেয়, তাহলে ঐ বেচারা মরেছে! আর যে ইট-পাটকেল খেয়েও বাবার পিছে লেগে থাকবে, তার কপাল খুলে যাবে। পরশপাথর যে সে পাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আসলে উনি এভাবে লোকজনকে পরীক্ষা করেন। আজ আমি ওখানে গিয়েছিলাম। প্রায় পঞ্চাশজন লোক আজ উপস্থিত ছিলো। কেউ মিষ্টি, কেউ কাপড়, কেউ দামি উপহার নিয়ে গেছে বাবার কৃপাদৃষ্টিলাভের আশায়। তুফান বাবা তখন ধ্যান করছিলেন। চোখ খুলে যখন সমবেত লোকদের দেখতে পেলেন, ব্যস, পাথর নিয়ে দৌড়ে এলেন আমাদের দিকে। শুরু হয়ে গেলো দৌড়ঝাঁপ। যে যেদিকে পারে ছুটে পালালো। মুহূর্তের মধ্যে খালি হয়ে গেলো বাবার আস্তানা। একা আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ঝিম মেরে। উনি আমাকে পাথর ছুঁড়ে মারলেন। প্রথমটা এসে লাগলো মাথায়। ওনার নিশানা একেবারে অব্যর্থ। মাথা ফেটে রক্ত পড়তে শুরু করলো। কিন্তু আমি নড়বার পাত্র নই। এরপর উনি দ্বিতীয় পাথরটা মারলেন, হাতে এসে লাগলো ওটা। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলাম। যখন হুঁশ ফিরে এলো, দেখলাম বাবার আস্তানায় কেউ নেই, একেবারে নীরব হয়ে আছে চারিদিক। তুফান বাবাকেও কোথাও দেখতে পেলাম না। মনে হয় গায়েব হয়ে গেছেন। কাকে ডাকবো? কার কাছে সাহায্য চাইবো? মাথার ক্ষত থেকে তখনো রক্ত গড়াচ্ছে, অসহ্য ব্যথায় মনে হচ্ছে হাত ছিঁড়ে পড়ে যাবে। কোনোমতে হাঁচড়েপাচড়ে উঠে দাঁড়ালাম, সোজা চলে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার দেখে বললেন হাড় ভেঙে গেছে। ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বললেন, গরম সেঁক দিতে। হাড় ভেঙেছে এটা এমন বড়ো কিছু নয়, লটারির টিকেট যে আমার নামে উঠবে এটা এখন নিশ্চিত। তুফান বাবার মার খেয়েছে কেউ, কিন্তু মনোবাসনা পূরণ হয় নি, এমনটা কখনো হয় নি। আমি লটারি পেয়েই বাবার আস্তানা পাকা করে দেবো।’

বড়ো ঠাকুরের চেহারায় খুশির ছায়া খেলে গেলো। ত্বরিত বিছানা তৈরি হয়ে গেলো বিক্রমের জন্যে। প্রকাশ শুয়ে পড়লো সেই বিছানায়। ঠাকরুন তাড়াতাড়ি বিক্রমকে পাখা করতে লাগলেন। ছেলের সফলতার আশায় তার চেহারায়ও খেলা করছিলো এক অদ্ভুত প্রসন্নতা। সামান্য আঘাত সয়ে দশলাখ টাকা পেয়ে যাওয়া মোটেও সহজ কথা নয়! খিদের ঠ্যালায় ছোটো ঠাকুরের নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাচ্ছিলো। তবু এক পা-ও নড়ছিলেন না তিনি সেখান থেকে। যেই বড়ো ঠাকুর খাওয়ার জন্যে ভেতরে গেলেন আর ঠাকরুন প্রকাশের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে গেলেন, অমনি ছোটো ঠাকুর ছুটে এসে প্রকাশকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুফান বাবা কি খুব জোরে পাথর মারেন?’
প্রকাশ ছোটো ঠাকুরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বললো,‘আরে কাকা, পাথর তো নয়, মনে হয় যেন গোলা ছুঁড়ে মারছে! পালোয়ানের মতো শরীর, এক ঘুষিতে বাঘকে পর্যন্ত পরাস্ত করতে পারেন। কতো লোক যে একটা মাত্র পাথরের আঘাতে পটল তুলেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অথচ আজ পর্যন্ত কোনো মোকদ্দমাই হয় নি তুফান বাবার বিরুদ্ধে। আর বাবাও দু’-চারটে পাথর মেরেই ক্ষান্ত হন না, যতোক্ষণ না আপনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাচ্ছেন, ততোক্ষণ মারতেই থাকবেন। আর রহস্য এই, জখম যতো বেশি হবে, লক্ষ্য হাসিলের সম্ভাবনা ততোই বাড়বে।’
প্রকাশ এমন গল্প ফেঁদে বসলো যে, ছোটো ঠাকুর কুঁকড়ে গেলেন ভেতরে ভেতরে। তুফান বাবার আস্তানায় গিয়ে মার খাওয়ার সাহস হলো না।

শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ণয়ের দিন এসেই গেলো জুলাইয়ের বিশ তারিখ। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। আশা আর ভয়ের দোলাচলে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি নি রাতভর। বড়ো-ছোটো দুই ঠাকুর গঙ্গাস্নান সেরে মন্দিরে পুজো দিতে গেলেন। আজ আমার মনেও ভক্তি জেগে উঠলো। ভাবলাম মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে আসি।
‘হে প্রভু! তুমি অনাথের সহায়, আশ্রয়হীনের আশ্রয়, তুমি অন্তর্যামী, আমরা কতো কষ্ট করে টিকেট কিনেছি সেটা তুমি জানো প্রভু। তোমার কৃপাদৃষ্টি কি আমাদের ওপর পড়বে না প্রভু? আমাদের চেয়ে তোমার কৃপা পাওয়ার যোগ্য আর কে আছে?’
বিক্রম একেবারে সুটবুট পরে মন্দিরে হাজির। আমাকে ইশারা করে বললো,‘আমি ডাকঘরে যাচ্ছি!’ তারপর হাওয়া হয়ে গেলো। একটু পরে প্রকাশ মিষ্টির থালা হাতে নিয়ে মন্দিরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে গরিবদের মাঝে বিলি করতে শুরুকরলো। দুই ঠাকুর তখনো ভগবানের চরণ ছুঁয়ে পড়ে আছেন। মাথা নিচু করে, চোখ বুজে একমনে প্রার্থনা করে চলেছেন।হঠাৎ বড়ো ঠাকুর মাথা তুলে পুরোহিতের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ভগবান বড়োই ভক্তবৎসল, তাই না, পুরোহিত মশাই?’
পুরোহিত সমর্থন করলেন তাঁর কথা। বললেন,‘হ্যাঁ, বড়ো ঠাকুর, ভক্তের সুরক্ষার জন্যেই ভগবান ক্ষীরসাগর পাড়ি দিযেছেন, আর গজকে বাঁচিয়েছেন কুমিরের কবল থেকে।’
একটু পরে মাথা তুললেন ছোটো ঠাকুর। পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভগবান তো সর্বশক্তিমান, অন্তর্যামী, সবার মনের খবর জানেন, তাই না পুরোহিত মশাই?’পুরোহিত তাঁর কথাও সমর্থন করলেন। বললেন,‘অন্তর্যামী না হলে সবার মনের কথা কী ভাবে বুঝতে পারেন? শবরীর প্রেমের গভীরতা দেখেইতো তার মনোকামনা পূর্ণ করলেন।’
পূজা সমাপ্ত হলো। যখন ভজন শুরু হলো দুই ভাই মিলে জোরে জোরে ভজন গাইতে লাগলেন। বড়ো ঠাকুর দুই টাকা দান করলেন পুরোহিতের সামনে রাখা থালায়। তা দেখে ছোটো ঠাকুর দান করলেন চার টাকা। বড়ো ঠাকুর কোপনজরে কিছুক্ষণ চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তারপর পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,‘আপনার মন কী বলছে পুরোহিত মশাই?’
‘আপনার জয় সুনিশ্চিত, বড়ো ঠাকুর!’
ছোটো ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন,‘আর আমার?’
‘আপনারও জয় হবে, ছোটো ঠাকুর!’
বড়ো ঠাকুর সশ্রদ্ধ চিত্তে ভজন গাইতে গাইতে মন্দির থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আর তার পিছে পিছে ছোটো ঠাকুরও চললেন প্রভুর গুনগান গাইতে গাইতে।আমিও বেরিয়ে এলাম তাদের পিছুপিছু। বাইরে এসে প্রকাশ বাবুকে সাহায্য করতে চাইলাম মিঠাই বিতরণে। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমি একাই করতে পারবো, মাস্টার বাবু। আর বেশি তো বাকি নেই, ধন্যবাদ!’ আমি লজ্জা পেয়ে ডাকঘর অভিমুখে রওনা দিলাম। এমন সময় দেখলাম বিক্রম হাসিমুখে সাইকেল চালিয়ে এদিকেই আসছে। তাকে দেখার সাথে সাথে সবাই যেন পাগল হয়ে গেলো। দুই ঠাকুর হামলে পড়লো তার ওপর বাজপাখির মতো। প্রকাশের থালায় তখনো অল্প মিঠাই পড়ে ছিলো, সেগুলো সহ থালাটা সে মাটিতে ফেলে দৌড়ে এলো বিক্রমের কাছে। আর আমি একফাঁকে বিক্রমকে কাঁধে তুলে নিয়ে নাচতে শুরু করলাম। সবাই মিলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। কিন্তু কেউ জানতে চাইছে না লটারির ফলাফল কী ! বড়ো ঠাকুর আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করে বললেন, ‘জয়, রাজা রামচন্দ্রের জয়!’
ছোটো ঠাকুর আরো জোরে বললেন, ‘জয়, হনুমানের জয়!’প্রকাশও তার ভক্তি জাহির করলো: ‘তুফান বাবার জয় হোক!’
বিক্রম সবার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আলাদা আলাদা দাঁড়িয়ে বলো দেখি সবাই, যার নামে লটারি উঠবে সে আমাকে একলাখ টাকা দেবে। বলো, রাজি?’
বড়ো ঠাকুর বিক্রমের হাত ধরে বললেন, ‘আগে বল্ কার নাম উঠেছে!’
‘জি না,’ বিক্রম জবাব দিলো। ‘আগে বলুন, আমার শর্তে সবাই রাজি?’ছোটো ঠাকুর রেগে গিয়ে বললেন,‘শুধু নাম বলার জন্যে একলাখ? শাবাশ!’
প্রকাশও গলা চড়িয়ে বললো, ‘আমরা কি ডাকঘর চিনি না?’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, যার যার নাম শোনার জন্যে তৈরি হয়ে যাও তবে!’
সবাই অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।‘হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখো সবাই।’সবাই পূর্ণ সচেতন হয়ে, কান সজাগ করে দাঁড়ালো।‘আচ্ছা, তো মন দিয়ে শুনুন সবাই। এই শহরের মানুষের বড়ো দুর্ভাগ্য, শুধু এই শহরের নয়, সমগ্র ভারতবাসীর দুর্ভাগ্য! লটারি জিতেছে আমেরিকার এক হাবশি লোক।’
‘মিথ্যে কথা!’ হুংকার দিয়ে উঠলেন বড়ো ঠাকুর।
‘ডাঁহা মিথ্যে কথা!’ছোটো ঠাকুরও যোগ দিলেন তার সাথে, ‘এটা কিছুতেই সত্যি হতে পারে না। তিনমাসের একনিষ্ঠ প্রার্থনা কিছুতেই বিফল হতে পারে না।’
‘হাত-মাথা ফাটিয়েছি কি এমনি এমনি, মশকরা করছিস, অ্যাঁ?’ প্রকাশের ক্ষিপ্ত উক্তি।এরকম আরো জনা পঁচিশেক লোক উদয় হলো কাঁদো-কাঁদো চেহারা নিয়ে। তারাও আসছে ডাকঘর থেকে, নিজেদের স্বপ্নের সমাধি রচনা করে।‘নিয়ে গেছে সব লুট করে, হারামজাদা হাবশি! বদমাশ, শয়তান!’ প্রলাপ বকছে সব ক্লান্ত শ্রান্ত হতাশ মানুষ ।বিশ্বাস না করার আর কোনো উপায় নেই। বড়ো ঠাকুর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গেলেন মন্দিরের দিকে। পুরোহিতকে ডিসমিস করে দিয়ে বললেন, ‘এজন্যে এতোদিন ধরে পালছি আপনাকে? হারাম খেয়ে খেয়ে চর্বি বাড়ানোর জন্যে?’
ছোটো ঠাকুরকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ তার কোমর ভেঙে দিয়েছে। দু’-তিনবার কপাল চাপড়ে রাস্তার মাঝখানেই বসে পড়লেন। কিন্তু প্রকাশের অবস্থা আরো ভয়ংকর। ক্রোধে অন্ধ হয়ে সে লাঠি হাতে ছূটে গেলো তুফান বাবার আস্তানার দিকে। আজ তুফান বাবাকেই মেরামত করা হবে।ঠাকরুন বললেন, ‘আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। নিশ্চয়ই সবাই বেঈমানী করেছে। দেব-দেবতার আর কী দোষ! তাঁরা কি অন্যদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনবেন?’রাতে কেউ খাবার মুখে দিলো না। আমি উদাস হয়ে বসে ছিলাম। বিক্রম এসে বললো, ‘চলো হোটেল থেকে কিছু খেয়ে আসি। আজ তো চুলা-ই জ্বলে নি ঘরে।’
আমি বিক্রমকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা তুমি যখন ডাকঘর থেকে ফিরে এলে তখন তোমাকে খুব খুশিখুশি লাগছিলো। ব্যাপারটা কী?’
‘আমি যখন ডাকঘরের সামনে হাজার হাজার লোকের ভিড় দেখতে পেলাম, তখন আমাদের পরিবারের লোকদের বোকামির কথা ভেবে ভীষণ হাসি পেলো। একটা শহরে যেখানে এতো লোক টিকেট কিনেছে, সারা হিন্দুস্তানে তো এর চেয়ে হাজারগুন বেশি হবে। আর সারা দুনিয়ার কথা ভাবো, লাখোগুন বেশি হবে না! আর আমি কিনা পর্বতপ্রমাণ আশা নিয়ে দৌড়ে গেলাম ডাকঘরে! যেই ফলাফল ঘোষণা করলো, আমার বিষম হাসি পেলো। এ যেন কোনো দানশীল ব্যক্তির তামাশা: একমুঠো ভাত নিয়ে যে ছড়িয়ে দিয়েছে লাখো লোকের মাঝে। আর আমাদের এখানে লোকজন কতো কিছু যে....'
আমিও হেসে ফেললাম ওর কথায়। বললাম, ‘ঠিকই বলেছো, আমরা দু’জনও লেখাজোকা করে নেওয়ার জন্যে কতো না বাড়াবাড়ি করেছি! আচ্ছা, একটা কথা সত্যি করে বলো তো, তোমার নিয়ত কি আসলেই খারাপ ছিলো?’
‘কী করবে এখন আর জেনে,’ মুচকি হেসে বললো বিক্রম। ‘রহস্যটা পরদার আড়ালেই না হয় ঢাকা থাক!'
.................

নিরাপদ দেশলাই

পোড়াবো! একদিন ঠিকই পোড়াবো!
আরও কিছুকাল যাক।
বুকের বামপাশে রেখেছি নিরাপদ দেশলাই
আপাতত আরও কিছুদিন ওখানেই সেটা থাক!